আল্লাহর সাহায্য পেতে হলে আগে মোমেন হতে হবে

180

সুলতানা রাজিয়া হেলেন:

সুপ্রভাত বগুড়া (ধর্ম ও জীবন): আল্লাহ তা’আলা রসুলাল্লাহকে (সা.) রহমাতাল্লিল আলামীন তথা পুরো মানবজাতির জন্য রহমত স্বরূপ প্রেরণ করেছেন। পূর্বে একটা একটা নির্দিষ্ট অঞ্চল, গোত্র বা সমাজের জন্য একেকজন নবী পাঠানো হতো। কিন্তু রসুলাল্লাহ যেহেতু শেষ রসুল তাই তাঁর উপর দায়িত্ব দেয়া হয়েছে পুরো মানবজাতির, পুরো পৃথিবীর। তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করে, শত অন্যায়- নির্যাতন সহ্য করে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।

ইসলামের সত্যবাণী সর্বত্র ছড়িয়ে দিতে একটা জাতি গঠন করেছেন, পুরো আরবকে ইসলামের ছায়াতলে এনেছেন। আরবের অসহায়, নিগৃহীত, দরিদ্র মানুষগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করে এক যোদ্ধা জাতিতে পরিণত করেছেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টার ফলে সমাজে ঐক্য-ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আসে, সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়, সামাজিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হয়, কুসংস্কার দূর হয়, মূর্তিপূজার মতো অনর্থক কাজ বন্ধ হয়ে যায়।

এভাবে অন্ধকারাচ্ছন্ন আরব সমাজ হেদায়াতের আলোয় আলোকিত হয়ে ওঠে। যেহেতু একজন মানুষের পক্ষে তার এক জীবনে পুরো পৃথিবীতে আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, তাই তিনি তাঁর অসমাপ্ত কাজের ভার তাঁর নিজ হাতে গড়া জাতির উপর দিয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান।

রসুলুল্লাহর দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার পর উম্মতে মোহাম্মদী নামক জাতিটি তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য তাদের বাড়ি-ঘর সহায়-সম্পত্তি, স্ত্রী-পুত্র, ক্ষেত-খামার বিসর্জন দিয়ে দিক বিদিক ছড়িয়ে পড়েন। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে তৎকালীন ‍দুটি পরাশক্তি পারস্য ও রোমান সাম্রাজ্যকে পরাজিত করে অর্ধ পৃথিবীকে ইসলামের ছায়াতলে আনেন।

কিন্তু রসুলাল্লাহর ওফাতের ৬০/৭০ বছর যেতে না যেতেই জাতি তাদের আকীদা ভুলে যায়। জাতি দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বের হওয়া প্রায় বন্ধ করে দেয়। অন্যান্য রাজা বাদশাদের মতো ভোগ- বিলাস, আরাম-আয়শে মত্ত হয়ে পড়ে, রাষ্ট্র-ক্ষমতার মোহ তাদেরকে পেয়ে বসে। আল্লাহ ও রসুল (সা.) দীন নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন, দীনের সংবিধান তথা কোর’আন হাদিসের অতি বিশ্লেষণ করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন ।

কিন্তু জাতি তাঁর এই নিষেধাজ্ঞা ভুলে গিয়ে মহা সমারোহে দীনের চুলচেরা বিশ্লেষণ তথা ব্যাখ্যা, অতি, অপব্যাখ্যা আরম্ভ করে। ফলে লক্ষ্যচ্যূত জাতি বহু মাযহাবে ও ফেরকায় বিভক্ত হয়ে শক্তিহীন হয়ে পড়ে। শুরু হয় নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, বিভেদ, দলাদলি, শত্রুতা, সংঘাত, রক্তারক্তি। যে জাতি জ্ঞানে-বিজ্ঞানে পৃথিবীর শিক্ষকের আসনে বসেছিল ,বিভিন্ন দিক দিয়ে মানবসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করেছিল তারা তাদের পরিনতি হিসাবে ইউরোপের বিভিন্ন খ্রিস্টান জাতির গোলামে পরিণত হয়।

জাতির এই করুণ পরিণতির কারণ আল্লাহর হুকুম ত্যাগ, রসুলাল্লাহর সুন্নাহ ত্যাগ। রসুলাল্লাহ বলেছেন, “যে আমার সুন্নাহ ত্যাগ করবে সে বা তারা আমার কেউ না।” [আবু হুরাইরা (রা.) থেকে মুসলিম] আল্লাহ বলেছেন, “যদি বের না হও, তবে আল্লাহ তোমাদের মর্মন্তুদ আযাব দেবেন এবং অপর জাতিকে তোমাদের স্থলাভিষিক্ত করবেন।

তোমরা তাঁর কোন ক্ষতি করতে পারবে না, আর আল্লাহ সর্ববিষয়ে শক্তিমান। ” (সুরা তওবা-৩৯)। কিন্তু মুসলমান নামধারী জাতিকে আজ কে বোঝাবে, আল্লাহর হুকুম ত্যাগ করার ফলে তারা আজ আর মোমেন নেই? শত শত বছর ধরে ইহুদি-খ্রিষ্টানদের গোলামী করছে এই জাতি। পৃথিবীর সর্বত্র আজ মুসলিমরা মার খাচ্ছে। ধর্ষিত হচ্ছে মুসলিম নারীরা, নিজ ভিটেমাটি থেকে উৎখাত হচ্ছে মুসলিমরা।

চোখের সামনে তাদের স্বজনদের হত্যা করা হচ্ছে। যেখানে মুসলমানদের উপর দাযিত্ব ছিল পুরো পৃথিবীতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করে মানবজাতিকে মুক্তি দেয়ার, সেখানে তারা নিজেরাই নিজেদের নিরাপত্তা দিতে পারছে না। মুসলমানদের জন্য এর চেয়ে বড় লজ্জার বিষয় আর কী হতে পারে! কিন্তু এটুকু উপলব্ধি করার ক্ষমতাটুকুও তারা আজ হারিযে ফেলেছে।

কে জাগাবে তাদের বিবেককে? কবে তারা নিজেদের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে পারবে? শুধু মুসলিমরাই নয়, পুরো মানবজাতিই আজ সংকটের মধ্য দিয়ে ‍যাচ্ছে। পৃথিবীর কোনো দেশেই আজ শান্তি নেই। আমরা আজ এমন একটা সময় অতিক্রম করছি যা আরবের জাহেলিয়াতকেও হার মানিয়েছে।

সকল প্রকার অন্যায়-অবিচারে ছেয়ে গেছে পৃথিবী। দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার, দরিদ্রের উপর ধনীর বঞ্চনা, শাসিতের উপর শাসকের অবিচার, ন্যায়ের উপর অন্যায়ের বিজয়, সরলের উপর ধূর্তের প্রতারণায় পৃথিবীর বাতাস আজ ভারী হয়ে গেছে। কোথাও একটু শান্তির নিঃশ্বাস ফেলার জায়গাটুকুও নেই! সমাজে সুদ, ঘুষ, চুরি,ডাকাতি, রাহাজানি, হত্যা, ধর্ষণ, বলাৎকার ধাই ধাই করে বেড়েই চলেছে। কোলের শিশুও আজ নরপশুদের কাছে নিরাপদ নয়।

আমরা প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে সফলতা লাভ করলেও মনের গভীরে দেউলিয়া, দিশেহারা। কোথায় গেলে শান্তি পাওয়া যাবে, কী করলে শান্তি আসবে এসব চিন্তায় মানুষ দিশাহারা। কোনো ব্যবস্থাতেই কাঙ্ক্ষিত সাফল্য আসছে না। বর্তমান বিশ্বে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান শান্তি প্রতিষ্ঠার নিমিত্তে কোটি কোটি টাকা খরচ করে যাচ্ছে কিন্তু শান্তি আসছে না। শান্তি প্রতিষ্টার জন্য বিভিন্ন মতবাদের উপর ভিত্তি করে সমাজতন্ত্র, রাজতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কিন্তু তা শান্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে।

প্রতিষ্ঠিত হয়েছে লীগ অব নেশন, জাতিসংঘ কিন্তু শান্তি আসে নি। এই যে এত প্রচেষ্টা, এত পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কিন্তু শান্তি আসছে না। একমাত্র কারণ, শান্তি প্রতিষ্ঠার এ প্রক্রিয়াগুলো ভুল, রাস্তাগুলো ভুল। আর ভুল পথে, উল্টা পথে হেঁটে আমরা কোনোদিনই গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব না। আগে সঠিক রাস্তায় উঠতে হবে। যিনি এই জগৎ সংসারের মালিক, হুকুম চলার কথা যার, আমরা আজ তাঁর হুকুম বাদ দিয়ে নিজেদের তৈরি করা আইন, বিধান দিয়ে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র পরিচালনা করছি। এই পথে কখনোই শান্তি আসবে না।

আজীবন চেষ্টা করলেও না। আল্লাহ কোর’আনে বলেছেন, আল্লাহ মোমেনদের ওয়ালী, অভিভাবক। আল্লাহ যদি মুসলমানদের অভিভাবক থাকেন তাহলে আমরা শত শত বছর ধরে পৃথিবীব্যাপী লাঞ্ছিত হচ্ছি কেন? ‍আমরা যারা নিজেদের রসুলের উম্মত বলে দাবী করি তাদের উপর দায়িত্ব চলে আসে রসুলের সুন্নাহকে নিজেদের মধ্যে ধারণ করে পৃথিবীব্যাপী আল্লাহর সত্যদীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম করা। অনেকেই বলতে পারে, এ চেষ্টা তো পৃথিবীতে অনেক দল, অনেক সংগঠন করছে, তাহলে আবার প্রচেষ্টা করার প্রসঙ্গ কোথা থেকে আসে? হ্যাঁ, চেষ্টা করছে অনেকেই, তবে সেটা ভুল পথে।

সঠিক পথে হলে আল্লাহর সাহায্য আমরা ঠিকই পেতাম। আল্লাহ সুরা আন নূরের ৫৫ নম্বর আয়াতে বলেছেন, “তোমরা যদি প্রকৃত মোমেন হও তবে পৃথিবীর কর্তৃত্ব তোমাদের হাতে দিব, যেমনটা পূর্ববর্তীদের হাতে দিয়েছিলাম।” ফলাফলই বলে দেয়, আল্লাহর দেখানো পথে আমরা নেই। আল্লাহ আজ আমাদের অভিভাবক নন। এখন আল্লাহকে নিজেদের অভিভাবক হিসাবে পেতে হলে, আল্লাহর সাহায্য পেতে হলে আমাদের প্রকৃত মোমেন হতে হবে।

নিজেদের জীবন সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করতে হবে। আল্লাহ সুরা হুজুরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে মোমেনের সংগায় বলেছেন. “মোমেন মূলত তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রসুলের প্রতি ঈমান আনার পর তাতে কোনো সন্দেহ করে না, এবং জীবন সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করে। আর তারাই সত্যনিষ্ঠ।” অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার অর্থ তাঁকে হুকুমদাতা হিসাবে মেনে নেয়া।

আর রসুলাল্লাহর প্রতি ঈমান আনার অর্থ তাঁকে রসুল হিসাবে, আদর্শ হিসাবে মেনে নেয়া। যারা আল্লাহকে হুকুমদাতা হিসাবে মেনে নিবে তাদের দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহর হুকুম, আল্লাহর সত্যদীন সমাজে প্রতিষ্ঠা করা। আর দীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিজয়ী হওয়ার জন্য লাগবে জীবন ও সম্পদ দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম। জাতি যখন থেকে দীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম বাদ দিয়েছে, তখনই মোমেনের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। আর তাই আল্লাহর পক্ষ থেকে সাহায্য আসাও বন্ধ হয়ে গেছে।