আসন্ন ঈদের সময়টাই আমাদের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে : ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা

174

মৃত্যু-সূচকে ১২০ দেশের চেয়ে এখন পর্যন্ত ভালো অবস্থানে বাংলাদেশ !

সুপ্রভাত বগুড়া ডেস্ক: যেকোনো রোগের মহামারির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ক্ষেত্রে প্রথম লক্ষ্য থাকে সংক্রমণ প্রতিহত করা। সংক্রমণ প্রত্যাশিত মাত্রায় রোধ করা না গেলে বা ব্যাপকভাবে সামাজিক সংক্রমণ ঘটলে তখন মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়—মৃত্যু কতটা ঠেকিয়ে রাখা যায়। কভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবেলায় দেশে দেশে এখন এই মৃত্যু ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে পড়েছে।

সে ক্ষেত্রে কম মৃত্যুর সূচকে বাংলাদেশ বিশ্বের ১৪৯টি দেশের মধ্যে ১২০টি দেশকে পেছনে ফেলে ভালো অবস্থানে রয়েছে। বিশ্বখ্যাত জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। ইউরোপ আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলোর বেশির ভাগই এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে তুলনামূলক খারাপ অবস্থানে।

অন্যদিকে বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে আছে মাত্র ২৮টি দেশ। দেশের ভেতরে এখন পর্যন্ত সংক্রমণের পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৬৪টি জেলার মধ্যে ১০০ জনের নিচে সংক্রমণ রয়েছে ৫৪ জেলায়। বাকি ১০ জেলায় ১০০ জনের ওপরে করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে। আবার ৫০ জনের নিচে সংক্রমিত জেলার সংখ্যা ৩৯টি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, করোনাভাইরাস সংক্রমণে গতকাল পর্যন্ত মৃত ২৩৯ জনের মধ্যে ঢাকায় ১৩৪ ও নারায়ণগঞ্জে ৩৮ জন সর্বোচ্চ। এরপর রয়েছে চট্টগ্রামে ১৩ জন। বাকি জেলাগুলোতে মৃত্যু এক থেকে পাঁচজনের মধ্যে। দেশের এই পরিস্থিতিকে অনেকাংশেই সুবিধাজনক পর্যায়ে রাখছেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে এ ক্ষেত্রে আসন্ন ঈদুল ফিতরকে বড় ধরনের মাইলফলক হিসেবে দেখতে চান সবাই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদের সময়টা আমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। গত দেড় মাস যতটুকু সংযত রাখা গেছে তা ঈদ পর্যন্ত ধরে রাখা গেলে বাংলাদেশের জন্য করোনা জয় অনেকটা সহজ হবে।

তবে ঈদে সংযমী না থেকে কেনাকাটা ও এক স্থান থেকে অন্যত্র যাতায়াত বেড়ে গেলে উল্টো ফল আসতে পারে। তখন মৃত্যুহারও বেড়ে যেতে পারে। আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার বিশ্লেষণে জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের গতকাল সোমবারের তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রে ৬, যুক্তরাজ্যে ১৯ দশমিক ৬, ইতালিতে ১৩ দশমিক ৯, স্পেনে ১১ দশমিক ৮, ফ্রান্সে ১৪ দশমিক ৯, ব্রাজিলে ৬ দশমিক ৮, বেলজিয়ামে ১৬ দশমিক ৩, সুইডেনে ১২ দশমিক ৪, হাঙ্গেরিতে ১২ দশমিক ৬, জার্মানিতে ৪ দশমিক ৪, কানাডায় ৭, মেক্সিকোতে ১০, নেদারল্যান্ডসে ১২ দশমিক ৮ ও জাপানে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ।

সে ক্ষেত্রে গতকাল পর্যন্ত বাংলাদেশে আক্রান্ত হিসেবে শনাক্তদের মধ্যে মৃত্যুর হার মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী গতকাল পর্যন্ত দেশে আক্রান্ত হিসেবে মোট শনাক্ত হয়েছে ১৫ হাজার ৬৯১ জন। আর মোট মৃত্যু হয়েছে ২৩৯ জনের। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেকটি তথ্যের বিশ্লেষণে পাওয়া যায়, ১৪৯টি দেশের মধ্যে ২০ হাজারের নিচে সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে বাংলাদেশসহ ১২০টি দেশে। এ ক্ষেত্রেও মাত্র ২৫টি দেশ বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ আক্রান্তদের মধ্যে মৃত্যুহার বাংলাদেশের চেয়ে কম।

করোনাভাইরাস মোকাবেলায় সরকারের কারিগরি বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যসচিব এবং রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ড. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসন্ন ঈদের সময়টাই আমাদের জন্য এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। এই ঈদের পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। মানুষ যদি এই ১৫-২০ দিন ঘর থেকে বের না হওয়া, জরুরি নয় এমন কেনাকাটা না করা এবং এক স্থান থেকে আরেক স্থানে যাতায়াত না করে তবে আমরা এর খুব ভালো সুফল পাব। অন্যথায় স্বস্তির এই সূচক উল্টে যেতে পারে।’

আরেক রোগতত্ত্ববিদ ও আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘সংক্রমণ ঠেকাতে না পারলেও কম মৃত্যুর সূচকে অনেক বড় বড় দেশের চেয়ে আমরা এগিয়ে আছি। এটি অবশ্যই একটি ভালো দিক। মৃত্যু কম রাখা গেলে, সংক্রমিত হলেও একধরনের সুরক্ষা মেলে। অবশ্য সংক্রমণ যত বেশি হবে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা বা চিকিৎসার সুবিধা ততটা কমতে থাকবে।

আর তখন মৃত্যুহার বেড়ে যায়। উন্নত বিশ্বে যেমনটা হচ্ছে। সেদিকে নজর রেখেই আমাদের আগামী ঈদের সময় যেকোনো মূল্যেই হোক মানুষের যাতায়াত, কেনাকাটা, ঘোরাফেরা বন্ধ করতে হবে। তা না হলে কিন্তু ঈদের আনন্দ পরবর্তীতে আমাদের জন্য বড় শোকাবহ পরিবেশ তৈরি করতে পারে।’ সূত্র: কালের কন্ঠ