এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সম্মূখিন আমরা; কেউ জানেনা এ বিপর্যয়ের শেষ কোথায় !!

100
এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের সম্মূখিন আমরা; কেউ জানেনা এ বিপর্যয়ের শেষ কোথায় !! প্রতিকী-ছবি

আজ দেশে করোনা সনাক্তের ৩মাস পূর্ণ হলো !

সুপ্রভাত বগুড়া ডেস্ক: গত ৮ মার্চ দেশে করোনার প্রথম রোগী শনাক্ত হয়। আজ ৮ জুন অর্থাৎ তিন মাসের মাথায় করোনার বিষাক্ত ছোবলে নীল হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। এই সময়ে করোনার থাবার ব্যাপক বিস্তারে যে বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে তাতে প্রতিদিনই যুক্ত হচ্ছে হাজার হাজার রোগী, সেই সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। প্রাণঘাতী এ ভাইরাসের সর্বগ্রাসী আঘাতে বিশ্বব্যাপী সংকট তৈরি হয়েছে, বাংলাদেশ এর বাইরে নয়।

জীবন ও জীবিকার মধ্যে যুদ্ধাবস্থার তৈরি হয়েছে, তা থেকে কখন উত্তরণ ঘটবে তা কেউ বলতে পারছে না। এ মহামারীকে বিদায় করতে চিকিৎসকেরা ভ্যাকসিন কিংবা প্রতিরোধমূলক ওষুধ আবিষ্কারের প্রাণান্তকর চেষ্টা করলেও বারবার ভাইরাসের চরিত্র বদলের কারণে কোনো কূল-কিনারা হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতির মধ্যে করোনাকে নিয়ন্ত্রণে এনে লকডাউন শিথিল করে অর্থনীতির চাকা সচল করার চেষ্টা চলছে।

বিভিন্ন গবেষণা বলছে, করোনার এই বিস্তার শিগগিরই থামবে এমন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। হয়তো অধিকাংশ মানুষের মাঝে এর সংক্রমণ ঘটে নি¤œ পর্যায়ে নেমে আসবে। কিন্তু যে পর্যন্ত না এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয় কিংবা ভাইরাস নিজ থেকেই বিদায় না হয়, সে পর্যন্ত তা-ব চলবে। জীবনধারা ব্যাপক পরিবর্তন এনে সকলের সর্বাত্মক চেষ্টায় কিছুটা দমিয়ে রাখা যাবে কিন্তু পরাজিত করা হয়তো কখনো সম্ভব নাও হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্প্যানি ফ্লু, প্লেগ ও ইবোলার মতো অনেক মহামারী যখন পৃথিবীকে মৃত্যুপুরীতে তৈরি করেছিল, তখন এর চিকিৎসায় কোনো ওষুধ আবিষ্কার হয়নি।

এটি নিজে নিজে বিতাড়িত হয়েছিল অথবা রোগগুলো যখন নিজ থেকে বিদায় নিচ্ছিল সেই সময় কিংবা তারও অনেক পরে এর টিকা অথবা ওষুধ আবিষ্কার হয়।
ওয়ার্ল্ডোমিটার অনুযায়ী, করোনার আক্রান্তের দিক থেকে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, পাকিস্তানে সংক্রমণের ভয়াবহতা শুরু হয় তিন মাস পর। অর্থাৎ চতুর্থ মাসে গিয়ে সংক্রমণ বাড়তে থাকে। আবার স্পেন, জার্মানি, ইতালি ও জার্মানি কড়াকড়ি লকডাউন করে চতুর্থ মাসে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে শুরু করে।

পৃথিবীর অন্য দেশের সঙ্গে সংক্রমণের ধারার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অধিক আক্রান্ত দেশগুলো সর্বোচ্চ পর্যায়ে (পিকে) ২০ শতাংশের কাছাকাছি কিংবা এর বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ জনে ২০ জনে শরীরের কোভিড-১৯ এর উপস্থিতি পায়। বাংলাদেশে গত প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে গড়ে প্রতিদিন ২০ শতাংশের বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে। সে হিসেবে এখন দেশে সর্বোচ্চ পর্যায়ে সংক্রমণ হচ্ছে। তবে কম পরীক্ষার কারণে প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না বলে সব মহলের দাবি।

অন্য দেশের পরিসংখ্যানের সঙ্গে বাংলাদেশের চিত্র বিশ্লেষণ করে আরও দেখা যায়, দেশে এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে আক্রান্ত শুরু হয়েছে এবং তা আর অন্তত মাসখানেক চলবে। চতুর্থ মাসে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া কিংবা ভারতের মতো দেশের পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। তারপর তা ধীরে ধীরে কমতে থাকবে। তবে সবকিছু নির্ভর করছে সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের ওপর।

ওয়ার্ল্ডোমিটারের তথ্য মতে, গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত সারাবিশ্বে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৭০ লক্ষের বেশি। মৃতের সংখ্যা ৪ লাখের বেশি। আর সুস্থ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৩৪ লাখ আক্রান্ত ব্যক্তি। বর্তমানে ৩১ লাখ আক্রান্তের মধ্যে ৯৮ শতাংশের মৃদু সংক্রমণ হয়েছে। সংকটাপন্ন রয়েছেন মাত্র ২ শতাংশ রোগী। বাংলাদেশে প্রথম রোগী শনাক্ত হয় তিনজন। তারপর দুই, তিন পাঁচ, দশ- এভাবে বাড়তে বাড়তে এ সংখ্যা এখন ৩ হাজারের কোঠায়।

গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ২ হাজার ৭৪৩ জনের মধ্যে সংক্রমণ ধরা পড়েছে। ফলে মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল ৬৫ হাজার ৭৬৯ জনে। গতকাল মৃত্যু হয়েছে রেকর্ড ৪২ জন। মোট মৃত্যু হয়েছে ৮৮৮ জনের। বিপজ্জনক পরিস্থিতির মধ্যে দেশের অর্থনীতি পরিস্থিতি ক্রমশ খারাপ হচ্ছে। বিভিন্ন গবেষণা বলছে, করোনার কারণে বর্তমান অচলাবস্থা দীর্ঘকাল অব্যাহত থাকলে কর্মসংস্থান, অর্থনীতি, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক শৃঙ্খলার ওপর এর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

তাই লকডাউনের ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠার ক্ষমতা ধনী রাষ্ট্রগুলোর থাকলেও নি¤œ ও মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রগুলো এ বাস্তবতায় কতদূর টিকে থাকতে পারবে, সেটি একটি কঠিন প্রশ্ন। এমন কঠিন বাস্তবতায় অনেক দেশ লকডাউন শিথিল করে ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু করেছে। কিন্তু তাদের জীবনধারা আগের মতো নয়। তারপরও সবাই ভ্যাকসিন কিংবা ওষুধ আবিষ্কারের দিকে তাকিয়ে আছে। কিন্তু কয়েকটি আশাব্যাঞ্জক খবর পাওয়া গেলেও কবে তা আলোর মুখ দেখবে তা এখনই কেউ বলতে পারছে না। কেউ কেউ ভিন্ন মতও দিচ্ছেন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের অনেকেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন, এইডস বা ডেঙ্গুর মতো কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন তৈরি কোনো দিন আবিষ্কার হবে না। এ দিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘হু’ জানিয়েছে, করোনার সংক্রমণ রোধে এর প্রতিষেধক আবিষ্কারের লক্ষ্যে ১০২টি গবেষণার মধ্যে আপাতত আটটি মানবদেহে পরীক্ষার পর্যায়ে পৌঁছেছে। তবে তার জীবাণুনাশক ক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে বহু সময় প্রয়োজন।

এমন সম্ভাবনায় বিশ্বে করোনা প্রকোপ থেকে মুক্তির আশা জেগেছে ভ্যাকসিন তৈরিতে। হয়তো ভ্যাকসিন তৈরিতে পৃথিবীর মানুষরা করোনা জয় করবে। এমন প্রত্যয় নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা। লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের বিশ্ব স্বাস্থ্য বিভাগের অধ্যাপক ডেভিড নাবারোর মতে, কিছু কিছু ভাইরাসের এখনো টিকা আবিষ্কার হয়নি। আর হবে এমন কোনো কথাও নেই।

যদি তা আবিষ্কার করাও যায়, সব পরীক্ষায় সেই প্রতিষেধক উত্তীর্ণ হবে, এমন ভাবাও ভুল। তবে ব্রিটেনের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব অ্যালার্জি অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজের ডিরেক্টর অ্যান্থনি ফাউসির মতে, ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়। তবে সেটার নির্দিষ্ট সময় ১২ থেকে ১৮ মাস লাগে।

হিউস্টনের বেইলর কলেজ অব মেডিসিনের ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিভাগের ডিন পিটার হোটেজ দাবি করেছেন, যে কোনো নতুন ভাইরাসের প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে ১৮ মাসের বেশি সময় লাগেনি। চিকিৎসক বিজ্ঞানীদের নিজেদের মধ্যেই এমন যুক্তিই প্রমাণ করে করোনার এই ভ্যাকসিন নিয়েই বেশ বিপাকেই পড়েছেন তারা। তবে বেশিসংখ্যক চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা আশার আলো দেখিয়ে বলছেন, করোনার টিকা দ্রুতই আসবে এবং তা মানবদেহে প্রয়োগও হবে।

অবশ্য, বিশ্বের অন্য দেশের তুলনায় চীন ও যুক্তরাষ্ট্র করোনার ভ্যাকসিন তৈরির দৌড়ে এগিয়ে আছে। যে দেশই টিকা আবিষ্কার আগে করতে পারবে, সে দেশই অর্থনৈতিক তো বটেই কূটনৈতিকভাবেও তার ফায়দা আদায় করে নেওয়ার চেষ্টা করবে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দেশের বর্তমান অবস্থা প্রসঙ্গে বলেন, পৃথিবীর সব দেশই এ ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। বেশিরভাগ দেশ সফল হয়েছে। আমাদেরও তাই করতে হবে। তারপর তা নির্মূলে কাজ করতে হবে।

করোনা ভাইরাসের কারণে টানা ৬৬ দিন সাধারণ ছুটির পর গত ৩১ মে সরকারি, বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলো চালু হয়েছে। এরই মধ্যে পরিস্থিতির অবনতি হচ্ছে প্রতিদিন। এ পরিপ্রেক্ষিতে সংক্রমণ পরিস্থিতি বিবেচনায় বিভিন্ন এলাকাকে তিন ভাগে ভাগ করে ভিন্নভাবে লকডাউন ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার। এলাকাগুলোকে রেড, অরেঞ্জ ও গ্রিন জোনে ভাগ করা হয়েছে, যেন চিহ্নিত জায়গাগুলোতে বিশেষ নজর দিয়ে সংক্রমণকে দমিয়ে রাখা যায়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক মনে করেন, বাংলাদেশকে করোনা পরিস্থিতি আগে নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। তারপর নির্মূলের কথা ভাবতে হবে। আমাদের সময় তিনি আরও বলেন, নিউইয়র্কে গত দুইদিন ধরে কোনো মৃত্যু নেই। অর্থাৎ তারা ভাইরাসটিকে নিয়ন্ত্রণে এনেছে। স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স, জার্মানিসহ অনেক দেশ কোভিড-১৯ নিয়ন্ত্রণে এনেছে। তারপর তারা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যাচ্ছে। এখন তারা ভ্যাকসিন ও ওষুধ আবিষ্কারের চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, আমেরিকা ৫৫ ও স্পেন ৪৫ দিনে করোনা আক্রান্তের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আমাদের কবে পিকে যাবে, কবে থামবে তা বলা যাচ্ছে না। কারণ, ব্যবস্থাপনা ও সমন্বয়হীনতা রয়েছে। পরীক্ষা কম হচ্ছে। তাই আমাদেরও আগে নিয়ন্ত্রণ আনতে হবে। নিয়ন্ত্রণ আনলে একদিন নির্মূল হবে।

প্রিভেন্টিভ মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী আমাদের সময়কে বলেন, প্রথমত. করোনা প্রতিরোধে যে পরিকল্পনা নেওয়ার কথা ছিল তা আমরা পারিনি। দ্বিতীয়ত, প্রতিরোধের দুই পথ আছে- প্রিভেনশন ও চিকিৎসা। দুটি ক্ষেত্রে যোগ্য ব্যক্তিদের দিয়ে কৌশল গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছি। তিনি বলেন, আমাদের হাতে প্রচুর সময় ছিল।

সিদ্ধান্তহীনতা ও কী করতে হবে, সেই বিশ্লেষণের অজ্ঞতা এবং এ কারণেই মাঝে মাঝে পথ পরিবর্তন করে জনভোগান্তি বাড়িয়েছি, সঙ্গে বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। ডা. লেলিনের পরামর্শ, এখন দুইটি কাজ করতে হবে। প্রতিরোধের জন্য কঠোর লকডাউন আর বৃত্তের ভেতরে বৃত্ত তৈরি করতে হবে।

অর্থাৎ রেড জোনের ভেতরে হটস্পট চিহ্নিত করে আরও ছোট জোনে ভাগ করতে হবে। র‌্যাপিড পরীক্ষার মাধ্যমে আক্রান্তদের আইসোলেশনে নিতে হবে। এ জন্য মিরপুরের টোলারবাগকে মডেল হিসেবে ধরে সেভাবে কাজ করার ব্যাপারে মত দিয়ে বলেন, এভাবে অন্তত ১৪ থেকে ২১ দিন কঠোর লকডাউন করতে পারলে কম ক্ষতির মাধ্যমে এ যুদ্ধে বিজয়ী হওয়া সম্ভব হবে।