খোশ আমদেদ হিজরী নববর্ষ ১৪৪৩

377
খোশ আমদেদ হিজরী নববর্ষ ১৪৪৩

আলহাজ্ব হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুল হক

জীবনের পাতা থেকে ঝরে গেল আরেকটি বছর। বছর পরিক্রমায় শেষ হলো আরো ১২টি মাস। স্বাগত নতুন নববর্ষ ১৪৪৩হিজরী। খোলাফায়ে রাশেদার শাসনকালে মদীনাকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার গোড়াপত্তন হলে সরকারি তথ্যাদির নথি ও দিনক্ষণের হিসাব রাখতে গিয়ে বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নররা বিপাকে পড়েন। তখন ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো বর্ষপঞ্জি বা একক সন চালু ছিল না। তাই রাষ্ট্রীয় কার্যাদি সুচারুরূপে ও যথা নিয়মে সম্পন্ন করার জন্য নতুন সন প্রবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়ে। খলীফা হযরত উমর (রাঃ)-এর শাসন আমলে বিখ্যাত সাহাবী হযরত আবু মূসা আশআরি (রাঃ) ১৬হিজরীতে ইরাক ও কুফার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

একবার হযরত আবু মূসা আশআরি (রাঃ) খলীফা হযরত উমর (রাঃ)-এর খেদমতে এ মর্মে পত্র লিখেন যে,আপনার পক্ষ থেকে পরামর্শ কিংবা নির্দেশ সংবলিত যেসব চিঠি আমাদের কাছে পৌঁছে তাতে দিন,মাস,সন,তারিখ,ইত্যাদি না থাকায় কোন চিঠি কোন দিনের, কোন চিঠি আগের আর কোনটি পরের তা নিরূপণ করা সম্ভবপর হয় না। এতে করে আমাদের আপনার নির্দেশ কার্যকর করতে খুব কষ্ট করতে হয়।

অনেক সময় আমরা বিব্রতবোধ করি চিঠির ধারাবাহিকতা না পেয়ে। হযরত আবু মূসা আশআরি (রাঃ)-এর চিঠি পেয়ে খলীফা হযরত উমর (রাঃ)-এ মর্মে পরামর্শ সভার আহŸান করেন যে,এখন থেকে একটি ইসলামী তারিখ প্রবর্তন করতে হবে। উক্ত পরামর্শ সভায় হযরত উসমান (রাঃ) ও হযরত আলী (রাঃ) সহ শীর্ষস্থানীয় সাহাবায়ে কেরাম এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত সবার পরামর্শ ও মতামতের ভিত্তিতে এ সভায় হযরত উমর (রাঃ) সিদ্ধান্ত দেন ইসলামী সন প্রবর্তনের।

তবে কোন মাস থেকে বর্ষের সূচনা করা হবে তা নিয়ে পরস্পরের মাঝে মতভেদ সৃষ্টি হয়। কেউ মত পোষণ করে রাসূল (সাঃ)-এর জন্মের মাস রবিউল আউয়াল থেকে বর্ষ শুরু করা হোক। হযরত উমর (রাঃ) বললেন,নবীজির জন্মের মাস থেকে হিজরী সনের গণনা করা যাবে না। কারণ খ্রিষ্টানরা হযরত ঈসা (আঃ)-এর জন্¥ের মাস থেকেই খ্রিষ্টাব্দের গণনা শুরু করেছিল। তাই রাসূলের জন্মের মাস থেকে সূচনা করা হলে বাহ্যিকভাবে খ্রিষ্টানদের অনুসরণ ও সাদৃশ্যতা হয়ে যায়,যা মুসলমানদের জন্য নিষিদ্ধ। কেউ এই রায় দিলেন,রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর ইন্তেকালের মাস থেকে বর্ষ শুরু করা হোক।

খলীফা এ মতটিকেও নাকচ করে দেন এই বলে যে,এতে প্রিয় নবীজির মৃত্যুব্যথা বারবার আমাদের মাঝে উন্থিত হবে। পাশাপাশি যুগ যুগ ধরে মৃত্যুর শোক পালনের একটা কুপ্রথা চালু হবে। এভাবে তিনি বিভিন্ন মতামতকে যুক্তিদিয়ে খন্ডন করেন। এরপর কেউ কেউ হিজরতের মাস থেকে বর্ষ শুরু করার কথা বলেন। হযরত উমর (রাঃ)-এর কাছে এ মতটি অত্যন্ত পছন্দনীয় হয়। এই প্রক্ষাপটে অবশেষে মহানবী (সাঃ)-এর হিজরতের ঘটনাকে মহিমান্বিত করার জন্য মুহররম মাস থেকে হিজরী নামে একটি স্বতন্ত্র সন চালু করার ঘোষনা দেন খলীফা হযরত উমর (রাঃ)।

যদিও রাসূল (সাঃ) রবিউল আউয়াল মাসে হিজরত করেন কিন্তু তিনি মুহররম মাস থেকেই হিজরতের ইচ্ছা পোষণ করনে। বিধায় মুহররমকে হিজরী সনের ১ম মাস নির্ধারণ করা হয়। হযরত উমরের এই দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্যের সাথে উপস্থিত সকলেই একবাক্যে সহমত পোষণ করেন। এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত গৃহিত হয় রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর হিজরতের ১৬বছর পর ১০ই জুমাদাল উলা ৬৩৮সালে। হিজরী সন গনণা করা হয় চান্দ্র মাসের হিসেব অনুযায়ী। যা মুহররম মাস থেকে শুরু হয়ে যিলহজ মাসে শেষে হয়। হিজরী সন মুসলমানদের জীবনধারার সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।

এর সাথে আমাদের অনেক আমল শুদ্ধ হওয়া না হওয়া সম্পৃক্ত। যেমন,রোযা,হজ¦,যাকাত,ঈদ,কুরবানী ইত্যাদি। এ কারণে চান্দ্র মাসের হিসেব রাখা মুসলমানদের জন্য ফারযে কিফায়া ঘোষণা করা হয়েছে। চাঁদের হিসাব এত জরুরী যে,যদি একদিনও কমবেশি হয়ে যায়,তাহলে ইবাদতের ক্ষেত্রে অনেক অসুবিধা ও বিরাট ক্ষতির সম্মুখীন হবো আমরা। অথচ হিজরী নববর্ষ প্রতি বছর আমাদের দুয়ারে উপস্থিত হয় ঠিকই। কিন্তু তার কোনো আলোচনা ও আয়োজন আমাদের থাকে না।

আজ কত তারিখ দূরে থাক কত হিজরী এটা? তাও আমরা মনে রাখি না। ইসলামে হিজরী সন ও তারিখের গুরুত্ব অপরিসীম। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,আপনার নিকট তারা জিজ্ঞেস করে নতুন চাঁদের বিষয়ে। আপনি বলে দিন, এটি মানুষের জন্য সময় নির্ধারণ এবং হজে¦র সময় ঠিক করার মাধ্যম। (সূরাঃবাকারা, আয়াতঃ১৮৯) এতে সুষ্পষ্ট ভবে প্রতীয়মান হয় যে,ইসলামী শরীয়তে চান্দ্রমাসের হিসাবই নির্ধারিত। রমযান,ঈদ,কুরবানী ইত্যাদি নতুন চাঁদ দেখার উপর নির্ভরশীল ও আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য।