চালাকবিহীন গাড়ি এখন আর স্বপ্ন নয়, সত্যি !!

74
চালাকবিহীন গাড়ি এখন আর স্বপ্ন নয়, সত্যি !!

মানুষ আসলে স্বপ্নবাজ এক প্রাণী। স্বপ্ন পুরণের জন্য কত কি না করে। এই যেমন একসময় মানুষ স্বপ্ন দেখেছে আকাশে উড়ার। গত শতাব্দীর গোড়ার দিকে সেই স্বপ্ন পুরণ হয়েছে। পাখিকে দেখে মানুষের মাঝে আকাশে ওড়ার স্বপ্ন জাগে, ইশ আমিও যদি পাখির মত উড়তে পারতাম!

মার্কিন মুলুকের দুই ভাই উইলবার ও অলবার রাইট ভ্রাতৃদ্বয় এ্যারোপ্লেন আবিষ্কারের মাধ্যমে হাজার বছরের লালিত আকাশে ওড়ার স্বপ্ন পুরণ করে। এরপর গত সেঞ্চুরিতে প্রযুক্তি এগিয়েছে বহুদুর। প্রযুক্তির সাহায্যে অনেক অসাধ্য সাধন করেছে এই মানুষ। মোবাইল, কম্পিউটারসহ প্রযুক্তির নানা আবিষ্কারের সুফল ভোগ করছে মানুষ।

এসব আবিষ্কারের মতই একসময় সড়কে চালকবিহীন গাড়ি তৈরির স্বপ্ন দেখা শুরু করে মানুষ। চালকবিহীন গাড়ি এও কি সম্ভব? প্রথমে কিন্তু তেমনটাই মনে হয়েছিল। তবে এখন সেই স্বপ্ন আর শুধু স্বপ্ন নয়, বাস্তবতায় রুপ নিয়েছে। চালকবিহীন গাড়ি এখন মানুষের হাতের নাগালে। চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের রাস্তায় চালকবিহীন গাড়ি চলছে এখন সীমিত পরিসরে।

চালাকবিহীন গাড়ি এখন আর স্বপ্ন নয়, সত্যি !!

চীনের প্রযুক্তি কোম্পানি বাইদু দুই ধরনের গাড়িতে চালকবিহীন তথা অটোনোমাস পাইলট প্রযুক্তি স্থাপন করেছে। কার এবং ছোট মিনিবাসে। বাইদু উদ্ভাবিত চালকবিহীন গাড়ির নাম অ্যাপোলো। অ্যাপোলো স্পিডব্রেকার দেখলে কিংবা সামনে রাস্তা পারাপারে মানুষ দেখলে অটো ব্রেক করে, রাস্তায় অন্য গাড়িকে অটোমেটিকভাবে সাইড দেয়। এর উপরে চতুর্দিকে বিশেষ ক্যামেরাসহ সেন্সর বসানো।

এছাড়া ইঞ্জিনে অটোনোমাস ড্রাইভিং সফটওয়ার বসানো যা সেন্সর ক্যামেরার সাথে সংযুক্ত। এর মাধ্যমেই গাড়ি তাৎক্ষণিক বুঝতে পারে কোথায় থামতে হবে, কতটুকু সাইড দিতে হবে, কখন চলতে হবে ইত্যাদি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সে চীন যে কি পরিমাণ উন্নতি করেছে তার বড় উদাহরণ এই চালকবিহীন গাড়ি। প্রথম জেনারেশনের ছোট্ট মিনিবাস ঘণ্টায় ৬০ কিলোমিটার বেগে চলতে পারে।

বর্তমানে তৃতীয় চতুর্থ প্রজন্মের চালকবিহীন কার, রোবোট্যাক্সি উদ্ভাবন করেছে এই কোম্পানি। এগুলো রাস্তায় ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার বেগে চলতে সক্ষম। অ্যাপোলো চীনের সবচেয়ে সুক্ষ্ণ ও দক্ষ প্রযুক্তি নির্ভর চালকবিহীন গাড়ি। বিখ্যাত গবেষণা প্রতিষ্ঠান নেভিগ্যান্ট রিসার্চ অ্যাপোলোকে শ্রেষ্ঠত্বের তকমা দিয়েছে। বাইদু উদ্ভাবিত চালকবিহীন গাড়ি বর্তমানে বেইজিং, ছাংসা, শেনজেনসহ চীনের ১০টি শহরে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া শহরের রাস্তায় পরীক্ষামূলকভাবে চলাচল করছে।

চীনের ১০টি গাড়ি তৈরি প্রতিষ্ঠানের সাথে ইতোমধ্যে চালকবিহীন প্রযুক্তির গাড়ি তৈরির চুক্তি করেছে বাইদু। ২০২৩ সাল থেকে এই গাড়ি রাস্তায় অন্যান্য গাড়ির সাথে পুরোপুরিভাবে চলাচল শুরু করবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ। বাইদুর মোবাইল প্ল্যাটফর্মের রোবোট্যাক্সি ’লুবো কইপাও’। স্মার্ট ফোনের সাহায্যে ‘অ্যাপোলো গো’ নামে অ্যাপসের মাধ্যমে যাত্রী এই রোবোট্যাক্সিকে কল করা, নেভিগেশন অর্থাৎ কোথায় যাবে সব নির্দেশ দিতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩০ টি শহরের রাস্তায় ৫০০ লুবো কইপাও রোবোট্যাক্সি অ্যাপোলো গো অ্যাপসের মাধ্যমে পরীক্ষামুলকভাবে চলাচল করছে। চীনের জনবহুল শেনজেন শহরে এরই মধ্যে অ্যাপোলো গো অ্যাপসের মাধ্যমে যাত্রীরা অর্থের বিনিময়ে রোবোট্যাক্সিতে চলাচল শুরু করেছে। এছাড়া চ্যাংজৌ এবং চংছিং শহরে লুবো কইপাও রোবোট্যাক্সি অর্থের বিনিময়ে যাত্রী পরিবহনের লাইসেন্স পেয়েছে।

রাতে এবং দুর্যোগপূর্ণ বা বিশেষ আবহাওয়াতে এই রোবোট্যাক্সি বেইজিং শহরে চলাচলের অনুমতি লাভ করেছে। কর্তপক্ষের আশা ২০২৫ সালের মধ্যে চীনের ৬৫ টি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০টি শহরে অ্যাপোলো গো অপারেশনের রোবোট্যাক্সি চালু করা।

এরই মধ্যে কোনরকম দুর্ঘটনা ছাড়াই চালকবিহীন গাড়ি ২৭ মিলিয়ন বা ২৭০ লাখ কিলোমিটার পথ পারি দিয়েছে। বাইদুই বিশ্বের একমাত্র চাইনিজ কোম্পানি যা ১০ মিলিয়ন কিলোমিটারের বেশি রাস্তায় চালকবিহীন গাড়ির পরীক্ষামূলক চলাচল সম্পন্ন করেছে। চীনে ৫৯৩টি পরীক্ষামূলক চলাচলের লাইসেন্স পেয়েছে বাইদুর চালকবিহীন গাড়ি।

এর মধ্যে ৩৯৮টি পরীক্ষামূলক চলাচলে সাধারণ যাত্রীরা গাড়িতে চড়ার সুযোগ পেয়েছে। বাইদু ২০১৭ সাল থেকে চালকবিহীন গাড়ি উদ্ভাবন বা তৈরি করছে। ২০২১ সালে বাইদু টেকনোজি কোম্পানি চাইনিজ গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান গিলির সাথে যৌথভাবে জিদু নামে চালকবিহীন গাড়ি তথা ইন্টেলিজেন্ট ভেহিকল সার্ভিস কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেছে।

এই কোম্পানি উদ্ভাবিত চালকবিহীন কারের নাম হল রোবো-১। এটি আগামী বছর থেকে বাজারে পাওয়া যাবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ। চালকবিহীন এই রোবো কারের দাম কিন্তু বেশিরভাগ লোকের নাগালের মধ্যেই থাকবে।

কর্তৃপক্ষ বলছে একেকটি রোবো-১ কারের দাম পড়বে ৩০ হাজার মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩০ লাখ টাকা। তবে বাংলাদেশে ট্যাক্স যুক্ত হলে এর দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। জিদু চালকবিহীন গাড়ি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় ও পরিচিত করে তুলতে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।