জাকাত কি সবার উপর ফরজ?

1
জাকাত কি সবার উপর ফরজ?

শরিয়তে ইসলামিয়ার দৃস্টিতে জাকাত একটি ফরজ বিধান তবে তা সকলের উপর ফরজ নয়। স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্ক ও সম্পদশালী মুসলমানদের উপরই কেবল জাকাত ফরয। এক্ষেত্রে কিছু শর্ত রয়েছে
নিত্যপ্রয়োজনীয় মৌলিকচাহিদা মেটানোর পর এক চন্দ্র বছরের জন্য কমপক্ষে ৮৫ গ্রাম সোনা বা ৫৯৫ গ্রাম রূপা অথবা এর কোনো একটির সমমূল্যের নগদ অর্থ কিংবা অন্যান্য সম্পদ কোনো ব্যক্তির মালিকানায় থাকলে প্রতি জাকাত অর্থবছরে সংশ্লিষ্ট সম্পদ থেকে ২.৫% হারে জাকাত আদায় করা তাঁর উপর ফরজ।

জাকাত প্রযোজ্য হয় এমন সম্পদ সমূহ হলোঃ নগদ টাকা, সোনা, রূপা, সব ধরনের বাণিজ্যিক পণ্য, গবাদি পশু ও নির্দিষ্ট কৃষিপণ্য।

Pop Ads

কোনো ব্যক্তির ওপর ইবাদাত ফরয হওয়ার জন্য কিছু শর্ত থাকে। জাকাত ফরয হওয়ার জন্যও কিছু শর্ত আছে। এগুলোর মধ্যে কিছু শর্ত ব্যক্তির সাথে সম্পর্কিত; আবার জাকাত আর্থিক ইবাদাত হওয়ায় সম্পদের সাথে সম্পর্কিত কিছু শর্তও আছে।

কখন রোজা ভাঙ্গা যাবে?
কত টাকা থাকলে জাকাত দিতে হয়?
দেশে দেশে বৈচিত্র্যময় রোজা পালন
মস্তিস্ক অপারেশন করলে কি রোজার ক্ষতি হবে?

নিন্মে উভয় প্রকারের শর্তগুলো উল্লেখ করা হলো
ক. ব্যক্তির ক্ষেত্রে শর্ত
মুসলিম হওয়া: জাকাত ফরয হওয়ার জন্য প্রথম শর্ত হলো মুসলিম হওয়া।

বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া: শাফে‘ঈ, মালেকী ও হাম্বলী মাযহাব মতে, সম্পদশালী শিশুর ওপর জাকাত ফরয হবে প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া সত্ত্বেও। তার সম্পদ হতে তার ওয়ালী বা দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক জাকাত আদায় করবেন। হানাফী মাযহাব মতে, জাকাত ফরয হওয়ার জন্য বালেগ বা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া শর্ত। অতএব, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বে শিশুর সম্পদে জাকাত নেই। তবে শিশুর মালিকানাধীন জমিতে উৎপন্ন ফসলে উশর ফরয হবে। (ইসলামি ফিকহ বিশ্বকোষ: মাওসূ‘আতুল ফিক্ইয়াহ ২৩:২৩২)।

বিবেক-বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া: হানাফী মাযহাব মতে, জাকাত ফরয হওয়ার জন্য বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়ার শর্ত রয়েছে। তাই পাগলের ওপর জাকাত ফরয নয়। যুক্তি হিসেবে তাঁরা তিন প্রকারের ব্যক্তির ওপর হতে তাখলীফের কলম তুলে নেয়ার হাদীসটি উল্লেখ করেন। অন্যান্য মাযহাব মতে, পাগলের ওপর জাকাত ফরয হবে, তার পক্ষ হতে দায়িত্বপ্রাপ্ত অভিভাবক জাকাত আদায় করবেন।

স্বাধীন ব্যক্তি হওয়া: জাকাত ফরয হওয়ার জন্য সম্পদের মালিকের স্বাধীন হওয়া অন্যতম শর্ত।

জীবিত থাকা: অতএব মৃতের সম্পদ থেকে অনাদায়ী জাকাত আদায় করা আবশ্যক নয়। তবে যদি মরার আগে তার জাকাত আদায়ের জন্য ওসিয়ত করে যায়, তখন ওয়ারিশদের জন্য তার পক্ষ্য থেকে জাকাত করতে হবে। কেননা হানাফী আলিমদের মতে, জাকাত একটি ইবাদত। অতএব সেটি হয়তো নিজে আদায় করবে। অথবা ওসিয়ত করে যেতে হবে। ওসিয়ত না করে গেলে আদায় করা আবশ্যক নয়। তবে ওয়ারিশরা ইচ্ছা করলে আদায় করতে পারবে।

মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা ৬/৪৬১-৪৬২; রদ্দুল মুহতার ২/২৫৯ রদ্দুল মুহতার ২/২৫৮, বাদায়েউস সানায়ে ২/৭৯,৮২,আল বাহরুর রায়েক ২/২২৭

নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা: জাকাত ফরয হওয়ার অন্যতম শর্ত হলো নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকা। শরী‘আহ কর্তৃক নির্ধারিত একটি নির্দিষ্টপরিমাণ সম্পদকে নিসাব বলে, যে পরিমাণ সম্পদ থাকলে জাকাত ফরয হয়।

সম্পদের ওপর পূর্ণ মালিকানা: জাকাত ফরয হওয়ার জন্য সম্পদের ওপর মালিকানা ও পূর্ণাঙ্গ দখল থাকতে হবে এবং সম্পদ ব্যবহারের ক্ষমতার অধিকারী হতে হবে, অন্যথায় জাকাত ফরয হবে না।

যৌথ মালিকানাভুক্ত সম্পত্তির জাকাত: কোনো সম্পদের দুই বা ততোধিক মালিক থাকলে প্রত্যেকে নিজ নিজ অংশের জাকাত দেবেন।

হারাম সম্পদের যাকাত: হারাম সম্পদ বলতে বুঝায় অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ। চুরি, ডাকাতি, সুদ, ঘুষ, ছিনতাই, রাহাজানি, অবৈধ ব্যবসা ইত্যাদি নানাবিধ অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ হারাম সম্পদ বা অবৈধ সম্পদ বলে গণ্য। হারাম পন্থায় উপার্জনকারী ব্যক্তি ঐ সম্পদেরমালিক নয়। অতএব, তা খরচের অধিকারও তার নেই। জাকাত প্রদানও এক ধরনের খরচ। তাই ফকীহগণ বলেন, হারাম সম্পদ হতে জাকাত দেয়া যাবে না। অবৈধ পন্থায় উপার্জিত সমুদয় সম্পদ প্রকৃত মালিককে ফেরত দিতে হবে। যদি প্রকৃত মালিক চিহ্নিত করা সম্ভব না হয় তাহলে সাওয়াবের নিয়াত ব্যতিরেকে পুরো সম্পদ গরিবমিসকীনকে দিয়ে দিতে হবে।

ধন-সম্পদের ক্ষেত্রে শর্ত

(১) সম্পদ বর্ধনযোগ্য হওয়াঃ জাকাত ফরয হওয়ার জন্য সম্পদ বর্ধনযোগ্য হওয়া বা বর্ধনক্ষম হওয়া শর্ত। এটি বাস্তবেও হতে পারে, আবার ধারণাগতভাবেও হতে পারে। কিছু সম্পদে বর্ধনশীলতার বিষয়টি দৃশ্যমান; যেমন, প্রজননের মাধ্যমে চতুষ্পদ জন্তু বৃদ্ধি পায়। উৎপাদিত ফসল তো বর্ধন ছাড়া আর কিছুই নয়। ব্যবসা ও বিনিয়োগের মাধ্যমে নগদ অর্থ বেড়ে যায়। স্বর্ণ-রৌপ্য বাহ্যিকভাবে না বাড়লেও মূল্যবৃদ্ধির মাধ্যমে এগুলো বর্ধনশীলতা প্রকাশ পায় (মাওসূ‘আ, ২৩: ২৪১; কারযাভী)।
(২) সম্পদ এক বছর অধিকারে থাকাঃ জাকাত ফরয হওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, মালিকের অধিকারে সম্পদ এক চান্দ্রবছর থাকা।

(৩) সম্পদ মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া: হানাফী মাযহাবের আলিমগণ জাকাত ফরয হওয়ার জন্য অতিরিক্ত একটি শর্তারোপ করেন, সেটি হলো জাকাতযোগ্য সম্পদ মৌলিক প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া। তাই নিত্যপ্রয়োজনীয় সম্পদের ওপর জাকাত ফরয হয় না।
(৪) ঋণমুক্ত হওয়া: জাকাত ফরয হওয়ার জন্য সম্পদ ঋণমুক্ত হওয়া শর্ত। ঋণের পরিমাণ বাদ দিয়ে কারো যদি নিসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকে তাহলে তার ওপর জাকাত ফরয হবে না।
(গ) জাকাত ফরয হওয়ার শর্তের সাথে সম্পর্কিত আরো কিছু বিষয়
(১) মৃত ব্যক্তির যাকাত: বিষয়টি মালিকানার শর্তের সাথে সম্পর্কিত। কোনো ব্যক্তির ওপর জাকাত ফরয হয়েছে, কিন্তু তিনি তা আদায় না করে মৃত্যুবরণ করেছেন; তাহলে তার রেখে যাওয়া সম্পদ হতে ওয়ারিশগণ বা সম্পদের তত্বাবধায়ক জাকাত আদায় করবে।
(২) বিদেশে রক্ষিত সম্পদের যাকাত: কারো সম্পদ যদি বিদেশের ব্যাংকে থাকে কিংবা কেউ যদি বিদেশে ব্যবসা করেন এবং ঐ সম্পদের ওপর জাকাত ফরয হয়, তাহলে তাকে জাকাত আদায় করতে হবে।
(৩) কয়েদি বা সাজাপ্রাপ্ত আসামীর যাকাত: কারাদন্ড বা বন্দিদশা জাকাত রহিত করে না। কারাবন্দী সে হাজতি হোক বা সাজাপ্রাপ্ত হোক নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তাকে জাকাত দিতে হবে।
(৪) মুসাফিরের যাকাত: সফরের কারণেও জাকাতের বিধান রহিত হয় না। মুসাফির ব্যক্তি যদি নিজ দেশে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন তাহলে ঐ সম্পদের জাকাত দিতে হবে। ঐ ব্যক্তির দেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য অপেক্ষা না করে তার পক্ষ থেকে তার আত্মীয় স্বজন বা সম্পদ-তত্বাবধায়ক জাকাত আদায় করবেন।
১. নেসাব পরিমাণ মালের মালিক হওয়া। অর্থাৎ সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ, বা সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা, কিংবা সমপরিমাণ মূল্যের নগদ টাকা বা ব্যবসার মালের মালিক হওয়া।
২. মুসলমান হওয়া। কাফেরের উপর জাকাত ফরজ নয়।
৩. বালেগ হওয়া। নাবালেগের উপর জাকাত ফরজ নয়।
৪. জ্ঞানী ও বিবেক সম্পন্ন হওয়া। সর্বদা যে পাগল থাকে তার নেসাব পরিমাণ মাল থাকলেও তার উপর জাকাত ফরজ নয়।
৫. নেসাব পরিমাণ মালের উপর এক বছর অতিবাহিত হওয়া।
৬. মাল বর্ধনশীল হওয়া।
৭. স্বাধীন বা মুক্ত হওয়া। দাস-দাসীর উপর জাকাত ফরজ নয়।
৮. মালের উপর পূর্ণ মালিকানা থাকা। অসম্পূর্ণ মালিকানার উপর জাকাত ফরজ হয় না।
৯. নেসাব পরিমাণ মাল নিত্য প্রয়োজনীয় সম্পদের অতিরিক্ত হওয়া।

যাদের উপর জাকাত ফরজ হয়

১. আগেই বলা হয়েছে যে, জাকাত ইসলামের একটি অপরিহার্য ইবাদত। এজন্য শুধু মুসলিমগণই জাকাত আদায়ের জন্য সম্বোধিত হন। সুস্থমস্তিষ্ক, আযাদ, বালেগ মুসলমান নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে জাকাত আদায় করা তার ওপর ফরয হয়ে যায়। -আদ্দুররুল মুখতার ২/২৫৯ বাদায়েউস সানায়ে ২/৭৯,৮২

কাফির যেহেতু ইবাদতের যোগ্যতা রাখে না তাই তাদের ওপর জাকাত আসে না।

এছাড়া অসুস্থমস্তিষ্ক মুসলিমের ওপর এবং নাবালেগ শিশু-কিশোরের ওপরও জাকাত ফরজ নয়।

মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বা ৬/৪৬১-৪৬২; রদ্দুল মুহতার ২/২৫৯ রদ্দুল মুহতার ২/২৫৮