জীবন-মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে প্রতিনিয়ত ছুটছে বিজ্ঞানীরা

147
জীবন-মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে প্রতিনিয়ত ছুটছে বিজ্ঞানীরা

সৃষ্টি জগতের সবচেয়ে বড় সত্য হলো মৃত্যু। সমুদ্র, পাহাড়, মরুভুমি আকাশ-পাতাল কোথাও পালিয়ে গিয়েও মৃত্যুকে আটকানো যাবে না। চিকিৎসা বিজ্ঞানের বাঁচিয়ে রাখার সীমা কেবল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। নিছক শারীরিক-মানসিক আরাম দেওয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ, এর বেশি নয়।

সভ্যতা পাল্টেছে, কিন্তু মৃত্যু থেকে বাঁচার সমাধান আজও মেলেনি। সমাধান না পেয়ে মানবসভ্যতার কপালে চিন্তার ভাজ। জীবন-মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে প্রতিনিয়ত ছুটছে বিজ্ঞানীরা। শত সহস্র কোটি টাকা খরচ করেছেন। অন্তরিক্ষের শেষ প্রান্তে চোখ রেখে বিজ্ঞানীরা  দেখছেন, মৃত্যুর কোনো উত্তর পাওয়া যায় কিনা।

কেন মৃত্যু হয়?

বিজ্ঞানের ভাষায়, সব জৈবিক ক্রিয়াকলাপের সমাপ্তিই মৃত্যুর কারণ। কখনো একটি বা গুচ্ছ কোষের, আবার কখনো সম্পূর্ণ দেহের কার্যকাল শেষ হলে জীবের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আরো কারণ হতে পারে বদ অভ্যাস, দূষণ, রোগ জীবাণুর আক্রমণ, দুর্ঘটনাসহ নানা কিছু। কোষের স্বাভাবিক  পুনর্গঠন ও কার্যকলাপ জন্ম থেকে বার্ধক্যে গিয়ে একেবারে কমে যায় বা বন্ধ হয়ে যায়। এই জৈবিক ক্রিয়া প্রতিবর্তনযোগ্য নয়। অর্থাৎ প্রত্যেক জীবকোষের জীবনকাল নির্দিষ্ট থাকার কারণে জৈবিক ক্রিয়া চালিয়ে রাখা অনেকটা অসম্ভব।

মৃত্যুকে কোনো ভাবে ফাঁকি দেওয়া কি সম্ভব?

এ পর্যন্ত বিভিন্ন গবেষণায় যা জানা গেছে, কোষের জীবন কাল নির্দিষ্ট। কাজেই জীবনের এক পর্যায়ে মৃত্যু আসবেই। যদি এই কোষের জীবন কাল বাড়ানো বা থামিয়ে দেওয়া যায়, তবে হয়তো  মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়ার কৌশল বের হয়ে আসবে।

মৃত্যুকে ফাঁকি দেওয়ার কৌশল এখনো বের করা না গেলেও জীবনকাল বৃদ্ধির গবেষণায় বিজ্ঞানী ও গবেষকেরা কিন্তু অনেক দূর এগিয়ে গেছে। যেমন টোকিয়োর জুন্টেন্ডো বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষক বৃদ্ধ ইদুরের গায়ে বিশেষ টিকা প্রয়োগ করে। এই টিকা ইদুরের বৃদ্ধপ্রায় কোষের  ক্ষয় হওয়ার গতি কমিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।

হাইড্রা নামে এক বিশেষ অমেরুদণ্ডী প্রাণী আছে, যার শরীর অধিকাংশই স্টেম সেল দিয়ে তৈরি। নতুন ঝকঝকে কোষ দিয়ে পুরনো কোষ প্রতিস্থাপনের জন্য স্টেম সেল প্রতিনিয়ত বিভাজিত হয়। মানব দেহেও স্টেম সেল আছে তবে সংখ্যায় অনেক কম। গবেষকেরা এই স্টেম সেল দিয়ে কোষের ক্ষয় রোধ বা প্রতিস্থাপনের কৌশল রপ্ত করার জন্য ব্যস্ত সময় পার করছে।

বিশ্বের খ্যাতনামা ধনী ব্যক্তিরা অমরত্ব পাওয়ার পদ্ধতি খুঁজতে ইতোমধ্যে শতকোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। জেফ বেজস, ইউরি মিলনারের মতো ধনকুবেররা বিশ্বের নাম করা বিজ্ঞানীদের নিয়ে অল্টজ ল্যাব স্থাপন করেছে। এই ল্যাবের অন্যতম কাজই হলো, জীবকোষের আয়ুষ্কাল বার্ধক্য থেকে পুনরায় যৌবনের দিকে আনা, অথবা ক্ষয়ে যাওয়া কোষ প্রতিস্থাপনের কৌশল বের করা।

বিশ্বের গণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, যন্ত্র প্রকৌশলের মাধ্যমেও অমরত্ব লাভের কথা চিন্তা করা হচ্ছে। যেমন স্মৃতি, ব্যক্তিত্ব এমনকি বংশগতির বাহক ডিএনএ-এর সূত্র যন্ত্রে সংরক্ষণের মাধ্যমে একজন মানুষকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখার পদ্ধতি প্রবর্তনের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। মৃত্যুর পরেও মানুষকে জীবিত সংরক্ষণের এই যন্ত্র তৈরির পেছনে রুশ কোটিপতি দিমিত্রি ইটস্কভ তার সম্পদ ব্যয় করে যাচ্ছেন।

দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার এই সব পদ্ধতি আজকালের মধ্যে সহজলোভ্য হচ্ছে না। বিজ্ঞানীরা এই বিষয়ে বেশ কিছু সময়ও চেয়েছেন। কারণ আরো অনেক গবেষণা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তারা নিশ্চিত হতে চাচ্ছেন। সাধারণত একজন মানুষের আয়ুষ্কাল গড়ে ৬০-৭০ বছরের মধ্যেই হয়। নানা রোগ ব্যাধি কিংবা  দুর্ঘটনায় বহু মানুষ এই আয়ুষ্কালের আগে বা পরে মারা যাচ্ছেন।

এখন ধরা যাক, কোনো রোগব্যাধি বা দুর্ঘটনা নাই, তাহলে একজন মানুষের তো অমরত্ব পাওয়ার কথা! নাহ, বিজ্ঞানিরা কিন্তু এ কথার সঙ্গেও একমত নন। সিংগাপুরের ঔষধ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জেরো ২০২১ সালে একটি গবেষণা চালায়। অসুস্থতা বা বয়োবৃদ্ধির কারণে লোহিত রক্ত কোনিকার ও চলাচলের সক্ষমতা হ্রাস বৃদ্ধি পরিমাপ করাই ছিল এই গবেষণার উদ্দেশ্য।

গবেষণায় দেখা যায়, নানা কারণে দেহ তার সুস্থ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসার সক্ষমতা বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হারাতে থাকে। এ কারণে কোনো প্রকার অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা না থাকলেও একজন মানুষ ১২০ থেকে ১৫০ বছর বাচঁতে পারবে, এর বেশি নয়।

একবার ভাবুন, পৃথিবীর ইতিহাসে কতো বড় বড় বিজ্ঞানী, সমাজপতি, দার্শনিক, শিল্পী মারা গেছেন। তাদের বাঁচিয়ে রাখা গেলে সভ্যতা আরো কতদূর এগিয়ে যেত। আবার অনেকে মনে করেন, পৃথিবীর ধবংসের অন্যতম কারণ হচ্ছে অতিরিক্ত জনসংখ্যা। সবাই যদি অমরত্ব পেয়ে যায় তবেই হবে মহা সংকট। অন্যদিকে, সৃষ্টি জগত যদি বিলুপ্ত হয়, তবে চিরজীবী থাকা কীভাবে সম্ভব!

শোনা যায়, মহাজ্ঞানী খিজির (আঃ) আবে হায়াত পান করে অমরত্ব লাভ করেছেন। এর মাধ্যমে দুনিয়ায় জীবিত আছেন এবং কিয়ামত পর্যন্ত জীবিত থাকবেন! মানব সভ্যতা আবে হায়াতের খোঁজ এখনো পায়নি। তবে সুস্থ, সবল, দীর্ঘায়ু লাভের চেষ্টা অব্যাহত আছে। কবির ভাষায় বলা যায় – “নেই-নেই-নেই- কারো নেই মৃত্যুভীতি, যেন মৃত্যুঞ্জয়ী,যেন চিরঞ্জীবী” এখন প্রশ্ন হলো নশ্বর পৃথিবীর অমরত্ব পাওয়া মানুষদের লালনের সক্ষমতা আদৌ আছে কি?