জেব্রাফিশের মাথায় সঙ্গে মানুষের মত স্তন্যপ্রায়ী জীবের মাথার শক্তখুলির সাদৃশ্য আবিষ্কার !

181
জেব্রাফিশের মাথায় সঙ্গে মানুষের মত স্তন্যপ্রায়ী জীবের মাথার শক্তখুলির সাদৃশ্য আবিষ্কার ! ছবি-সংগৃহীত

খালি চোখে না দেখা অদৃশ্য জগতের বিস্ময়কর ছবি !

সুপ্রভাত বগুড়া (বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি): জীবিত প্রাণের বিচারে খালি চোখে না দেখা আণুবীক্ষণিক জীবেরাই বহুগুণে বেশি। তাদের প্রায় অদৃশ্য জগতের নতুন রহস্য জানতে জীববিজ্ঞানের চেষ্টা চলে প্রতিনিয়ত। প্রযুক্তির বিকাশের হাত ধরে এখন এমন মাইক্রোস্কোপ আবিষ্কার হয়েছে যা অতিক্ষুদ্র ন্যানোমিটার (এক মিটারের দশ লাখ ভাগের এক ভাগ) আকারের জৈব প্রাণ নিয়ে গবেষণায় সাহায্য করে।

আণুবীক্ষণিক যন্ত্রে পর্যবেক্ষনের পাশাপাশি এগুলোর ছবি তোলার ব্যবস্থাও রয়েছে। তেমন চেষ্টাই করছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডে অবস্থিত ন্যাশনাল ইনস্টিটিউড অব হেলথের ব্রান্ট উইনস্টেইন ল্যাবের গবেষক ড্যানিয়েল ক্যাস্ট্রানোভা। অণুজীবের শৈল্পিক ছবি তুলে ধরার জন্য অনেকটাই সময় ব্যয় করে ফেলেন। পেছনে মাইক্রোস্কোপ ব্যবহারের জন্য অপেক্ষায় থাকা সহকর্মীর তাড়াও ছিল।

অণুজীবটির ছবি শুধু শৈল্পিকভাবেই মনোমুগ্ধকর নয়। অসাধারণ এক আবিষ্কারও লুকিয়ে ছিল তার মধ্যে। জেব্রাফিশের মাথায় এক ধরনের প্রত্যঙ্গ আছে, যার সঙ্গে মানুষ বা হাতির মতো স্তন্যপ্রায়ী জীবের মাথার শক্তখুলির রয়েছে অনেক মিল। ওই অবস্থাতেই বেশ কিছু ছবি তুলেছেন তিনি। ছবিগুলো বিভাজিত ছিল শত শত ফ্রেমে। যা পরবর্তীতে জোড়া লাগিয়ে একটি সম্পূর্ণ ছবি তৈরি করা হয়।

তরুণ এক জেব্রাফিশ অণুজীবের ছবি তুলেছিল তিনি। তাড়াহুড়ার মুহূর্তে এটির মাথা থেকে জুম আউট করে সম্পূর্ণ শরীর ফ্রেমে এনে শেষ একটা ছবি তোলেন। অবশ্য সঙ্গেসঙ্গেই তা বিশ্লেষণের সুযোগ না থাকায়, সেদিনের এত কষ্টের ছবির কথা ভুলেও গিয়েছিলেন প্রায়।

দুই সপ্তাহ পরে তিনি আণুবীক্ষণিক যন্ত্রের বিভাজিত ফ্রেমগুলো কম্পিউটারে জোড়া দিয়ে একটি সম্পূর্ণ ছবি পান। আর ফলাফল দেখে নিজেই হতবাক হয়ে যান। কারণ, চটজলদি শেষ মুহূর্তে তোলা ছবি থেকে তিনি বেশি কিছু আশা করেননি। ‘বিস্ময়ে তখন ভাবছিলাম, আরে চমৎকার ছবি উঠেছে তো,’ ক্যাস্ট্রানোভা যোগ করেন।

দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেছে জার্মান চিত্রগ্রাহক ড্যানিয়েল ন্যুপের তোলা ক্লাউনফিস নামক আরেক অণুজীবের ডিম ফুটে নিষিক্ত হওয়ার পাঁচটি ধাপ তুলে ধরা চিত্র। ছবি: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক

অণুজীবটির ছবি শুধু শৈল্পিকভাবেই মনোমুগ্ধকর নয়। অসাধারণ এক আবিষ্কারও লুকিয়ে ছিল তার মধ্যে। জেব্রাফিশের মাথায় এক ধরনের প্রত্যঙ্গ আছে, যার সঙ্গে মানুষ বা হাতির মতো স্তন্যপ্রায়ী জীবের মাথার শক্তখুলির রয়েছে অনেক মিল। আসলে ওই প্রত্যঙ্গটি অণুজীবটির জৈবিক ব্যবস্থায় ব্যবহৃত নানা ধরনের তরল উপাদান বহনের কাজ করে।

জেব্রাফিশ মানুষের মস্তিস্কেও হানা দেয়। এবং মাথায় থাকা ওই প্রত্যঙ্গটি তার দেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থার প্রধান অংশ। অ্যালঝেইমার-সহ মানুষের মগজে একাধিক রোগ সৃষ্টির জন্য দায়ী এ অণুজীবটি। দ্রুত বংশবিস্তার ক্ষমতার কারণে জীববিজ্ঞান পরীক্ষাগারে প্রায়শই সহজলভ্য জেব্রাফিশ। ক্ষুদ্র প্রাণটির মাথায় থাকা ওই প্রত্যঙ্গ নিয়ে গবেষণা করে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থায় যুক্ত প্রত্যঙ্গ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাবে, এমন আশা করছেন বিজ্ঞানীরা।

আবিষ্কারের নতুন দিগন্ত আর ছবির অসাধারণ সৌন্দর্যের কারণেই এবছর নিকন স্মল ওয়ার্ল্ড ফটোমাইক্রোগ্রাফি পুরস্কার জিতেছে ক্যাস্ট্রানোভার ছবিটি।

তৃতীয় স্থান লাভ করে মিঠাপানির শামুকের জিহ্বার এ চিত্র। এখানে রংধনুর মতো বর্নিল চিরূনির মতো যে অংশ দেখা যাচ্ছে, তা আসলে জিহ্বায় থাকা সূক্ষ্ম দাঁত। এর সাহায্যে খাদ্য ভেঙ্গে হজম করার মতো আকার দেয় শামুক। ছবি: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক গত ৪৬ বছর ধরে চলে আসা এ প্রতিযোগীতায় এবছরও পুরো বিশ্ব থেকে হাজার হাজার আণুবীক্ষণিক যন্ত্রে তোলা ছবি জমা পড়ে।
ঐসব ছবি বিশ্লেষণ করেন বিজ্ঞানী, চিত্রগ্রাহক এবং সাংবাদিকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্যানেল। গত ১৩ অক্টোবর প্রতিযোগীতায় বিজয়ী হিসেবে প্রথম পুরস্কার জিতে নেন ক্যাস্ট্রানোভা। আরও ২০ জন এবছর প্রতিযোগীতায় শীর্ষ স্থানে ছিলেন।
ফল ঘোষণার সময় দেওয়া এক বিবৃতিতে নিকন জানায়, ”গবেষণা, সৃজনশীল চিন্তা, ছবি তোলার কাজে প্রযুক্তির প্রয়োগ আর তাতে নিপুণ দক্ষতার সংমিশ্রণ এবারের বিজয়ী ছবিগুলো। এগুলো তুলে ধরতে পেরে আমরা গর্বিত। আগামীদিনের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারেও এদের ভূমিকা থাকবে। চলতি বছরের প্রথম স্থান অধিকার করা ছবিটি এমন বৈশিষ্ট্যের সব সেরা উদাহরণ। সূত্র: ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক