দেশে অপরাধের শীর্ষে অবৈধ পণ্য উৎপাদন

5
দেশে অপরাধের শীর্ষে অবৈধ পণ্য উৎপাদন

দেশে ২০০৯-১০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত ভোক্তা অধিদপ্তর পরিচালিত অভিযান এবং গ্রাহকদের অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অপরাধের শীর্ষে রয়েছে অনুমতি না নিয়ে অবৈধভাবে পণ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াকরণ। এসব কাজে অপরাধ করা হয়েছে ৩৮ হাজার ২৮৯টি, আর এসব অপরাধের জন্য জরিমানা করা হয়েছে ৩২ কোটি তিন লাখ সাত হাজার ৪৪০ টাকা। একইভাবে অপরাধের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে পণ্যের মোড়ক ব্যবহার না করা। এ ধরনের অপরাধ করা হয়েছে ৩৬ হাজার ৮৭৯টি, আর এসব অপরাধের জন্য জরিমানা করা হয়েছে ২০ কোটি ১৬ লাখ ২৭ হাজার ৩৩০ টাকা।

অভিযানে দেখা গেছে, একই প্রতিষ্ঠান একাধিকবার একই ধরনের অপরাধ করেছে। ভোক্তা অধিদপ্তর তাদের পরিচালিত অভিযান এবং ভোক্তাসাধারণের অভিযোগের ভিত্তিতে আইনের বিভিন্ন ধারায় মোট ১৭ ধরনের অপরাধ পেয়েছে। এর মধ্যে অপরাধের সংখ্যা বিবেচনায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্য বিক্রি, যার মধ্যে অন্যতম ওষুধ। মেয়াদ উত্তীর্ণ পণ্যের ৩৬ হাজার ৭১৮টি অপরাধে জরিমানা করা হয়েছে প্রায় ১৮ কোটি ৯৯ লাখ ২৯ হাজার টাকা।

Pop Ads

এ ছাড়া আরো অপরাধের মধ্যে রয়েছে মূল্যের তালিকা প্রদর্শন না করা, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দাম রাখা, প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা না দেওয়া, খাদ্যে ভেজাল মেশানো, ওজন পরিমাপক যন্ত্রে কারচুপি, পরিমাপে বা পরিমাপক ফিতা বা অন্য কিছুতে কারচুপি, অবহেলার মাধ্যমে সেবাগ্রহীতার ক্ষতি করা ইত্যাদি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এতে দেশের ভোক্তাসাধারণ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে অর্থনীতিতে দীর্ঘ মেয়াদের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। যেসব ব্যবসায়ী অবৈধ প্রক্রিয়া বা নকল পণ্য তৈরির সঙ্গে জড়িত, তাঁদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

একই সঙ্গে ভোক্তা অধিদপ্তর যে অভিযান পরিচালনা করছে, তা আরো জোরদার করতে হবে।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে চলতি বছরের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত সাড়ে ১৪ বছরে ৭১ হাজার ৮৯৬টি অভিযান পরিচালনা করে। এর মধ্যে বাজারে অভিযান পরিচালনা করে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে এক লাখ ৬৮ হাজার ৫৫৪টি প্রতিষ্ঠানকে। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে জরিমানা আদায় করা হয়েছে ১১৭ কোটি ১৯ লাখ ২৭ হাজার ২৪২ টাকা। একই সময়ে এক লাখ ১৮ হাজার ৬৬১ জন গ্রাহক ভোক্তা অধিদপ্তরে অভিযোগ করেছেন।

এসব অভিযোগের মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয়েছে এক লাখ ১৪ হাজার ৮৪৪ জনের। গ্রাহকদের অভিযোগের ভিত্তিতে ৯ হাজার ১০৫টি প্রতিষ্ঠানকে শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে। আর গ্রাহকদের অভিযোগের মধ্যে নিষ্পত্তি হয়নি তিন হাজার ৮১৭ জনের। নিষ্পত্তি না হওয়া এসব অভিযোগ ২০২৩-২৪ অর্থবছরের। অর্থাৎ আগের বছরগুলোর সব অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে। এ হিসাবে ৯৭.৬৮ শতাংশ অভিযোগ নিষ্পত্তি হয়েছে। বাকি ৩.৩২ শতাংশ অভিযোগ নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। এ পর্যন্ত অভিযোগের ভিত্তিতে আট হাজার ৯৩৯ জন অভিযোগকারী পেয়েছেন ২৫ শতাংশ হিসাবে এক কোটি ৫৮ লাখ ৮১ হাজার ৪৭৭ টাকা।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘অবৈধ প্রক্রিয়ায় পণ্য উৎপাদন বন্ধ হওয়া জরুরি। এই পক্রিয়া আমাদের উদ্যোক্তাদের নিরুৎসাহ করছে। যারা এভাবে পণ্য তৈরি করে তারা উদ্যোক্তা নয়, অপরাধী। একটি ব্র্যান্ডকে নকল করে পণ্য বানাবে, এটা হয় না। পণ্য উৎপাদন করতে হলে নিজের ব্র্যান্ড তৈরি করুন। নকল পণ্য তৈরি করে কেউ উদ্যোক্তা হতে পারে না। উদ্যোক্তা হতে হলে শ্রম দিতে হবে। ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযান আরো ব্যাপকভাবে করা দরকার।’

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের শাসনব্যবস্থার জন্য নকল পণ্য তৈরির এ কাজ হচ্ছে। এর জন্য আইনের সঠিক প্রয়োগ না হয়ে বাছাইকৃতভাবে আইনের প্রয়োগ হচ্ছে। যেমন—যখন একটি রেস্তোরাঁয় আগুন লাগল তখন হাজার হাজার রেস্তোরাঁয় অভিযান চালিয়ে পয়সা কামানো হলো। এভাবে আইনের প্রয়োগ হলে তা হবে না। এটি হতে হবে নিয়ম অনুযায়ী এবং ভোক্তা ও শিল্পবান্ধব।’

তিনি বলেন, ‘পণ্যে ভেজাল মেশালে বা নকল করলে অর্থনীতির বিপুল ক্ষতি হয়। ভোক্তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষের শারীরে নানা সমস্যা দেখা দেয়। এতে উৎপাদনশীলতা, কর্মদক্ষতা কমে যায়।’