পবিত্রতা জরুরি কেন ?

429

আলহাজ্ব হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুল হক

সু-প্রভাত বগুড়া (ধর্ম ও জীবন): ইসলামের দৃষ্টিতে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা কেবল নামাজ, কুরআন তেলাওয়াত ইত্যাদি ইবাদত শুদ্ধ হওয়ার পূর্ব শর্তই নয় বরং পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা মূলত দ্বীনের একটি স্বতন্ত্র ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তায়ালা তাওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অবলম্বনকারীদের পছন্দ করেন”। (সূরা: বাকারা, আয়াত: ২২২) অপর এক আয়াতে ‘কুবা’ জনপদের অধিবাসী মুসলমানদের প্রশংসা করতে গিয়ে আল্লাহ তায়ালা বলেন,“সেখানে এমন কিছু লোক রয়েছে যারা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে ভালোবাসে আর আল্লাহ তায়ালা পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন”। (সূরা: তাওবা, আয়াত: ১০৮) এই দুটি আয়াত থেকে বুঝা যায় ইসলামের দৃষ্টিতে পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব কত বেশি।

এমনিভাবে মুসলিম শরীফের একটি হাদিসে বলা হয়েছে “পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অঙ্গ”। অন্য হাদিসে আল্লাহর রাসূল সাঃ বলেন,“পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক”। হযরত মাওলানা শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহঃ) বলেন, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা ইসলামের মৌলিক চারটি বিষয়ের মধ্যে অন্যতম। তাই নাজাছাত অর্থাৎ নাপাকী সম্পর্কে জানতে হবে।

ফিকাহবিদদের মতে যে সমস্ত নাজাছাত চোখ দিয়ে দেখা যায় তা দুই ধরণেরঃ
(১) নাজাছাতে গলীজা বা বড় নাপাকী। যেমন:- মানুষের পেশাব, পায়খানা, রক্ত, বীর্য, মদ ইত্যাদি। এই নাজাছাতে গলীজার মধ্যে যেগুলো তরল যেমন:- রক্ত, পেশাব, সেগুলোর হুকুম হলো: গোলকৃতভাবে একটি কাঁচা টাকা বা হাতের তালুর নিচের স্থান পরিমানের সমান পর্যন্ত শরীর বা কাপড়ে লাগলে মাফ আছে। অর্থাৎ তা না ধুয়ে নামাজ পড়লে নামাজ হয়ে যাবে কিন্তু বিনা ওজরে স্বেচ্ছায় এরূপ করা অনুচিত ও এই পরিমানের চেয়ে বেশি হলে তা মাফ নয়। অর্থাৎ তা পাক না করে নামাজ পড়লে নামাজ হবে না। আর নাজাছাতে গলীজার মধ্যে যেগুলো গাঢ় বা শক্ত যেমন: গোবর, পায়খানা ইত্যাদি সেগুলোর হুকুম হচ্ছে: এক সিকি পরিমান পর্যন্ত অর্থাৎ ৪.৮৬ গ্রাম পর্যন্ত কাপড় বা শরীরে লাগলে মাফ। এর চেয়ে বেশি পরিমান লাগলে মাফ নয়। মাফের অর্থ বলা হয়েছে।

(২) নাজাছাতে খফীফা বা কিছুটা হালকা নাপাকী। যেমনঃ গরু মহিষসহ সকল হালাল পশুর পেশাব এবং সকল হারাম পাখির বিষ্ঠা। এই ধরনের নাজাছাত শরীর বা কাপড়ে লাগলে যে অংশে লাগবে তার চার ভাগের এক ভাগের কম হলে মাফ। আর পূর্ণ চার ভাগের এক ভাগ বা তার চেয়ে বেশি হলে মাফ নয়। জামার হাতা, কল্লি, আচঁল ইত্যাদি প্রত্যেকটা ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ বা অংশ বলে গণ্য হবে।

গাঢ় নাজাছাত শরীর বা কাপড়ে লাগলে পাক করার জন্য নাজাছাতকে এমনভাবে পরিস্কার করতে হবে যেন দাগ না থাকে। একবার অথবা দুইবার ধোয়ার পর এবং নাজাছাত চলে যাওয়া সত্তে¡ও যদি কিছু দাগ বা দূর্গন্ধ থেকে যায় তাতে কোন অসুবিধা নেই। আর পানির মত তরল নাজাছাত শরীর বা কাপড়ে লাগলে তিনবার ধুয়ে নিতে হবে এবং প্রত্যেকবার কাপড় ভালোভাবে নিংড়াতে হবে।

তৃতীয়বার খুব জোরে নিংড়াতে হবে। নচেৎ কাপড় পাক হবে না। কাপড় বা শরীরে নাজাছাত লাগলে চাই তা গাঢ় হোক বা তরল ধোয়া ছাড়া পাক করা যায় না। যে কোন সুস্থ স্বভাবের অধিকারী মানুষ সহবাস বা হায়েজ-নেফাসের কারণে সৃষ্ট আত্মিক আবিলতা ও প্রচ্ছন্নতা দূরীভূত করার জন্য গোসল আকশ্যক মনে করে। গোসল না করা পর্যন্ত নিজেকে কোন পবিত্র কাজ বা আমলে নিয়োজিত করা এমনকি কোন পবিত্রস্থান মাড়ানোরও উপযুক্ত মনে করে না।

এটা মানুষের সুস্থ স্বভাবের দাবি। ইসলামী শরীয়ত এ সকল অবস্থায় গোসল ফরজ করে দিয়েছে। নবীজি (সাঃ) বলেন, হায়েজগ্রস্থ নারীর গোসল ফরজ হওয়া ব্যক্তি কুরআন শরীফের কোন সূরা বা আয়াত পাঠ করবে না। (তিরমিজি) অন্য বর্ণনায় আছে, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) তাঁর খাদেম আনাস (রাঃ) কে সম্বোধন করে বললেন, হে আনাস! তুমি ফরজ গোসল করার সময় খুব ভালো করে গোসল করবে।

এরূপ করলে তুমি গোসল খানা থেকে এমতাবস্থায় বের হবে যে, তোমার সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে। আনাস (রাঃ) আরজ করলেন হে, আল্লাহর রাসূল! ভালোভাবে গোসল করার পদ্ধতি কি? নবীজি (সাঃ) বললেন, চুল ও পশমের গোড়াগুলো খুব ভালোভাবে ভিজাবে এবং সমস্ত শরীর খুব ভালো করে মলে পরিস্কার করে গোসল করবে। নবীজি (সাঃ) আরও বললেন, প্রিয় বৎস! সব সময় ওজুর সাথে থাকবে। যদি এটা সম্ভব হয় তবে বড়ই ফজিলতের বিষয়।

যার মৃত্যু ওজু অবস্থায় হবে তাকে শহীদের মর্যাদা দেয়া হবে। (বেহেশতী জেওর)
গোসলের মধ্যে তিনটি কাজ ফরজ। সেগুলো আদায় করা ছাড়া গোসল শুদ্ধ হয় না। মানুষ পবিত্র হয় না। যথা (১) এমন ভাবে কুলি করা যাতে মুখের সমস্ত জায়গায় পানি পৌঁছে যায়। (২) নাকের নরম স্থান পর্যন্ত পানি পৌঁছানো। (৩) সমস্ত শরীরে পানি পৌঁছানো।

এই তিনটি ফরজ আদায় করা ব্যতীত যত পানি দিয়েই গোসল করা হোক এবং যত রকম হালাল সাবান দিয়েই গোসল করা হক না কেন! মানুষ পবিত্র হতে পারে না। শরীয়ত মুতাবেক সে নাপাকই থেকে যায়। গোসলের সুন্নাত তরীকা হল: পরিত্রতার নিয়ত করার পর প্রথমে উভয় হাতের কব্জি পর্যন্ত ধৌত করা।

এরপর লজ্জাস্থান ধৌত করা। হাতে ও লজ্জাস্থানে নাপাকী থাকুক না থাকুক ধুয়ে নেয়া। তারপর শরীরের কোথাও নাপাকী লেগে থাকলে তা ধৌত করা। এরপর সুন্নত মুতাবেক ওজু করা। ওজু করার পর তিনবার মাথায় পানি ঢালা।

তারপর তিনবার ডান কাঁধে ও তিনবার বাম কাঁধে এমনভাবে পানি ঢালা যাতে সমস্ত শরীরে পানি পৌঁছে যায়। এবং পানি ঢালার সময় ভিজা হাত দ্বারা সমস্ত শরীর মলা।