বাতিল হলো এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা; জেএসসি ও এসএসসির গড় গ্রেডের ভিত্তিতে রেজাল্ট

175
বাতিল হলো এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা; জেএসসি ও এসএসসির গড় গ্রেডের ভিত্তিতে রেজাল্ট। ছবি-সংগ্রহ

সুপ্রভাত বগুড়া (শিক্ষা-সাহিত্য): চলমান করোনাভাইরাসে আটকে থাকা এবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শেষ পর্যন্ত বাতিল করা হয়েছে। ১ এপ্রিল এ পরীক্ষা শুরুর কথা ছিল। পরিস্থিতি উত্তরণের আশায় ছিলেন সরকারের নীতিনির্ধারকরা। কিন্তু এখন পর্যন্ত তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকির শঙ্কা রয়েই গেছে। বিদ্যমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরীক্ষা বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে পঞ্চম শ্রেণির সমাপনী বা পিইসি এবং অষ্টম শ্রেণির জুনিয়র স্কুল সার্টিফিকেট বা জেএসসি পরীক্ষা বাতিল করা হয়েছে।

তবে পরীক্ষা না হলেও শিক্ষার্থীদের গ্রেড দেয়া হবে। তাদের জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় প্রাপ্ত গ্রেড গড় করে এ ফল তৈরি করা হবে। ডিসেম্বরের শেষের দিকে প্রকাশ করা হবে এ ‘গড়’ ফল। এ ফল নিয়েই শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারবে। জানুয়ারিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় শুরু করা হবে ভর্তি কার্যক্রম। সরকারের এসব সিদ্ধান্তের কথা বুধবার দুপুরে এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি এমপি। এর ফলে এইচএসসিতে এবার ফরম পূরণ করা নিয়মিত শতভাগ শিক্ষার্থীই উত্তীর্ণ হচ্ছে।

এ ছাড়া গত বছর কাঙ্ক্ষিত ফল করতে না পারা মানোন্নয়নের এবং বিভাগ পরিবর্তনকারী পরীক্ষার্থীদেরও পাস করিয়ে দেয়া হবে। তবে তাদের ক্ষেত্রে নীতি কী হবে-সেটা নির্ধারণে একটি পরামর্শক কমিটি গঠন করা হয়েছে। যত দ্রুত সম্ভব এ কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করবে। এসএসসিতে এক বিভাগে পাস করে এইচএসসিতে আরেক বিভাগে লেখাপড়া শিক্ষার্থীদের বিভাগ পরিবর্তনকারী বলা হয়। গত বছর বিভিন্ন বিষয়ে ফেল করা শিক্ষার্থীদেরও পাস করিয়ে দেয়া হবে।

সব মিলিয়ে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো শতভাগ পরীক্ষার্থীই পাস করছে। সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা সরকারের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে প্রাপ্ত মতামত আমলে নেয়া হয়েছে। এ পরীক্ষা আগে এক বেঞ্চে দু’জন বসিয়ে নেয়া হলেও এখন নিতে হলে একজন বসাতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি অনুযায়ী পর্যাপ্ত দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। এ জন্য কেন্দ্র বেশি লাগবে।

পরীক্ষার পরিদর্শক, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, বোর্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারী দ্বিগুণ করতে হবে। প্রশ্নপত্র কেন্দ্র অনুযায়ী প্যাকেট করা আছে। দ্বিগুণ কেন্দ্র করা হলে প্যাকেট ভেঙে আলাদা করা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় তা সম্ভব নয়। আবার বিষয় কমিয়ে পরীক্ষা নেয়া যেতে পারত। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিকের প্রতিটি বিষয়ই গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যদিকে এ প্রক্রিয়ায় পরীক্ষা নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে পরীক্ষার আগে বা পরীক্ষাকালে কোনো শিক্ষার্থী বা তার পরিবারের সদস্য কোভিডে আক্রান্ত হলে তার ক্ষেত্রে কী হবে। এতসব বিবেচনায় নিয়ে পরীক্ষাসংক্রান্ত পরিকল্পনা তৈরি বড় চ্যালেঞ্জ। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, কোভিড পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে, সেই নিশ্চয়তা নেই। তাই সব মিলিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় শিক্ষার্থীদের সর্বাধিক কল্যাণ বিবেচনা করে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, ২০২০ সালের এইচএসসি পরীক্ষা সরাসরি গ্রহণ না করে ভিন্ন পদ্ধতিতে মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এরা দুটি পাবলিক পরীক্ষা অতিক্রম করে এসেছে। এদের জেএসসি ও এসএসসির ফলের গড় অনুযায়ী এইচএসসির ফল নির্ধারণ করা হবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, ছাত্রছাত্রীদের জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার তুলনায় এবারে ভালো প্রস্তুতি ছিল, পরীক্ষা তাদের ভালো হতে পারত-এমন অনেক কথাই বলা যায়।

কিন্তু খারাপও তো হতে পারত। আসলে এ ধরনের প্রশ্নের উত্তর কেউই দিতে পারবে না। ভবিষ্যতে চাকরির পরীক্ষায় সমসাময়িক ব্যাচের সঙ্গে বৈষম্য সংক্রান্ত আরেক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, একাত্তরে দেশমাতৃকার জন্য আমরা যুদ্ধ করেছি। আর এখন জীবনযুদ্ধ চলছে। এবারের সমস্যা বৈশ্বিক। আশা করছি, চাকরিদাতারা বিষয়টি আমলে নেবেন।

বৈশ্বিক পর্যায়েও বিষয়টি বিবেচিত হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে ভালো যেটা হবে, সেটাই গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি এর চেয়ে আদর্শ ব্যবস্থা আর পাইনি। আরেক প্রশ্নের উত্তরে মন্ত্রী বলেন, এ ফল তৈরি প্রক্রিয়ায় সুপারিশ প্রণয়নের কাজেই তো বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসিরা থাকছেন। সুতরাং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তবু যাতে সমস্যা না হয়, সেটা দেখা হবে।

আন্তর্জাতিকভাবে এ ফল গ্রহণযোগ্য হবে কি না-সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষা উপমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিকভাবে পরীক্ষার ক্ষেত্রে দুটি নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এক. প্রেডিকটেড রেজাল্ট (সম্ভাব্য ফল) দেয়া হচ্ছে, দুই. অতীতের পাবলিক পরীক্ষার ফলের ভিত্তিতে। আমরাও এর একটি গ্রহণ করেছি। তাছাড়া করোনা বিশ্ব বাস্তবতা। সব দেশই বিষয়টি বুঝবে। আরেক প্রশ্নের উত্তরে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, আমরা শিক্ষার্থীদের এবার সমন্বিত পরীক্ষায় ভর্তি করাব বিশ্ববিদ্যালয়ে।

এ জন্য গুচ্ছপদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষা আয়োজন করা হবে। তবে করোনার কারণে শেষ পর্যন্ত এ পরীক্ষা হয় কি না-সেই প্রশ্নের উত্তর পেতে আমাদের জানুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে যুক্ত ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব মাহবুবুর রহমান, কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের সচিব আমিনুল ইসলাম খানসহ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন অধিদফতরের মহাপরিচালক এবং বোর্ডের চেয়ারম্যানরা। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন মন্ত্রণালয়ের তথ্য ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল খায়ের।

এবার যারা এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা দিচ্ছে তারা ২০১৮ সালে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাস করেছে। তখন ১০টি শিক্ষা বোর্ডে ২০ লাখ ২৬ হাজার ৫৭৪ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। পাস করেছিল ১৫ লাখ ৭৬ হাজার ১০৪ জন। পাসের হার ছিল ৭৭ দশমিক ৭৭ শতাংশ। অন্যদিকে এ ব্যাচটিই ২০১৬ সালে জেএসসি-জেডিসি পাস করেছিল।

তখন ৯টি বোর্ডের অধীন অংশ নিয়েছিল ২৪ লাখ ১২ হাজার ৭৭৫ জন। এতে জেএসসিতে অংশ নিয়েছিল ১৯ লাখ ৯৩ হাজার ৩১৬ জন। আর ১৯ লাখ ২৯ হাজার ৯৯ জন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। গত বছর উচ্চ মাধ্যমিকে ফেল করেছিল ৩ লাখ ৪৮ হাজার ৪৫৭ জন শিক্ষার্থী। ৮ মার্চ দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ দেখা দেয়ার পর ১৭ মার্চ থেকে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আছে।

পরামর্শক কমিটি : শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক সংশ্লিষ্ট অতিরিক্ত সচিবকে আহ্বায়ক করে গঠন করা হচ্ছে এ কমিটি। এতে সদস্য সচিবের দায়িত্ব পালন করবেন ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং আন্তঃবিভাগ সমন্বয় কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মু. জিয়াউল হক।

সদস্য হলেন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের একজন প্রতিনিধি, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান। কমিটি নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে প্রতিবেদন দেবে। এরপর ডিসেম্বরের মধ্যে ফল প্রকাশ করা হবে। শিক্ষামন্ত্রী বলেন, জেএসসি এবং এসএসসির ফল থেকে কত শতাংশ করে নিয়ে এইচএসসির ফল তৈরি করা হবে-সেই সুপারিশও করবে পরামর্শক কমিটি। তাদের টার্মস অব রেফারেন্স (কার্যপরিধি) দেয়া হবে। সেটার আলোকেই তারা সুপারিশ করবে।

পরীক্ষার্থী সংখ্যা : এবার পরীক্ষার্থী ১৩ লাখ ৬৫ হাজার ৭৮৯ জন। এদের মধ্যে নিয়মিত ১০ লাখ ৭৯ হাজার ১৭১ জন। অনিয়মিত ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫০১ জন। অনিয়মিতদের মধ্যে এক বিষয়ে ফেল করা ১৬ হাজার ৯২ জন, ২ বিষয়ে ফেল করা ৫৪ হাজার ২২৪ জন, সব বিষয়ে ফেল করা ৫১ হাজার ৩৪৮ জন, মানোন্নয়ন ১৬ হাজার ৭২৭ জন এবং প্রাইভেট পরীক্ষার্থী ৩ হাজার ৩৯০ জন।

সাতটি বিষয়ে ১৩টি পত্রে পরীক্ষায় বসতে হয় শিক্ষার্থীদের। এর মধ্যে বাংলা ও ইংরেজির দুটি এবং আইসিটির একটিসহ ৫ বিষয়ে বিজ্ঞান, মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষাসহ সব বিভাগের শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দিতে হয়। বাকিগুলো বিভাগভেদে পছন্দমতো ঐচ্ছিক বিষয় থাকে। দুই বিষয়ে (সর্বোচ্চ চার পত্র) ফেল করলে পরের বছর শুধু ওইসব বিষয়ে পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ ছিল।

মিশ্র প্রতিক্রিয়া : এদিকে দুপুরে এই সিদ্ধান্ত প্রকাশের পর অনলাইন পত্রিকা, পোর্টাল, টেলিভিশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাতাসের গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর এ নিয়ে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মন্তব্য করেন। তাদের কেউ কেউ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ বাস্তবসম্মত নয় বলে উল্লেখ করেন। তবে ভালো প্রস্তুতি ছিল এমন কিছু ছাত্র ও ছাত্রী জানিয়েছে, জেএসসি ও এসএসসির তুলনায় তার প্রস্তুতি ভালো ছিল।

গড় ফল দেয়ায় যারা লেখাপড়া না করে ঘুরে বেড়িয়েছে তাদের সঙ্গে পার্থকা হল না। তাই যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ায় তারা খুশি হতে পারছে না। এক অভিভাবক বলেন, এটা একটা বাস্তবতা বিবর্জিত সিদ্ধান্ত। এটা দেশের ভবিষ্যৎ নষ্ট করবে। এক মা বলেন, কোনো একটা সিদ্ধান্ত হয়েছে, এটি ভালো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তিতে এখন যদি গড় ফলের কারণে তার ছেলে বঞ্চিত হয়, তাহলে সেই দায়ভার কে নেবে?

এ ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য পন্থা গ্রহণ করা উচিত। অপর এক অভিভাবক বলেন, পরিস্থিতি বিবেচনায় অপেক্ষাকৃত ভালো সিদ্ধান্ত হলেও ভবিষ্যতে কর্মক্ষেত্রে যদি বৈষম্যের শিকার হয়, তখন কী হবে? আরও কিছু দিন অপেক্ষা করা যেত। নতুবা স্বল্প পরিসরে হলেও মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা যেত। সূত্র: যুগান্তর