বোকা-চালাকের দ্বন্দ্ব

7
বোকা-চালাকের দ্বন্দ্ব

এক বোকা লোক কোদাল দিয়ে গর্ত খুঁড়ছে। পাশ দিয়েই যাচ্ছিল তার এক বন্ধু।

সে জিগ্যেস করল, ‘কি রে, গর্ত খুঁড়ছিস কেন?’

Pop Ads

‘ছবি তুলব তো, তাই গর্ত খুঁড়ছি।’

‘ছবি তোলার জন্য গর্ত খুঁড়ছিস, মানে?’

‘হয়েছে কি, আমার হাফ ছবি তুলতে হবে। আর জানিস তো, হাফ ছবি বুক পর্যন্ত হয়। তাই গর্তে নেমে ছবি তুলব, যাতে শুধু বুক পর্যন্ত ওঠে।’

এবার দ্বিতীয় জন বিষয়টা বুঝতে পেরে বলল, ‘তা কয় কপি ছবি তুলবি?’

প্রথম জন জানাল, ‘তিন কপি।’

দ্বিতীয় জন বলল, ‘আরে বোকার বোকা! তিন কপি ছবি তুললে একটা গর্ত খুঁড়ছিস কেন। অরো দুইটা খোঁড়।’

বোকাদের নিয়ে সমাজে এমন হাজারো গল্প চালু আছে। বোকাদের নিয়ে আমরা হাসাহাসি করি। তাদের সঙ্গে রঙ্গ-তামাশা করি। তাদের আরো বেশি বোকা বানাতে চাই। সমাজে আমরা একটু সহজ-সরল মানুষকে বোকা বলি। বুদ্ধু, বোকা, সুকুমার রায়ের ভাষায় ‘বোক-চোন্দর’ নানা অভিধায় অভিহিত করি। যদিও এই জগতে কেউই ঠিক বোকা নয়। বোকারাও অনেক সময় একজন চালাক মানুষের চেয়ে জ্ঞানী বা পরিপক্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। আবার চালাক মানুষেরা অনেক ক্ষেত্রে বোকার হদ্দর মতো কাজ করে।

সম্প্রতি একটি ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। সেখানে দেখা যাচ্ছে ক্লাসরুমে ‘বড় হয়ে কী হতে চাও’, শিক্ষকের এই প্রশ্নের উত্তরে ছোট একজন স্কুলপড়ুয়া ছেলে বলছে, সে বড় হয়ে বোকা হতে চায়। বড় হয়ে কেন বোকা হতে চায়, বিস্মিত শিক্ষকের এই প্রশ্নের জবাবে মুখে সরল হাসি ছড়িয়ে ছেলেটি বলে যে, বোকা হলে সে কখনো কাউকে ঠকাতে পারবে না।

বর্তমান জমানায় সত্যি আমরা সবাই বড় বেশি বুদ্ধিমান। কিন্তু যে বুদ্ধি অন্যকে ঠকিয়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করে, সেই বুদ্ধির থেকে যে বোকামি অনেক ভালো, সেই নির্মম সত্যটাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছে ঐ ছোট্ট ছেলেটি।

প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত পণ্ডিত চাণক্য বলেছেন যে, একজন বুদ্ধিমান মানুষ যেমন নানাভাবে তার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় রাখেন, তেমনই একজন বোকা মানুষ তার কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে বোকামির নিদর্শন ছড়িয়ে রাখেন। বুদ্ধিহীন মানুষদের খুব সহজেই চেনা যায়।

আচার্য চাণক্য আরো বলেছেন, এই ধরনের মানুষরা অনেকটা সন্ন্যাসীর মতো। কারণ সন্ন্যাসীদের মধ্যে যেমন কোনো ছলনা নেই, তেমনই এদের মধ্যেও কোনো ছলনা নেই। কী করা উচিত এবং কী করা উচিত নয়, সে সম্পর্কে এদের কোনো সঠিক ধারণা নেই। সেই কারণে এদের জীবনে অনেক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। অন্যের থেকে এরা সহজে আঘাত পান।

আচার্য চাণক্যর বাণী অনুসারে জ্ঞানী মানুষকে সবাই শ্রদ্ধা করেন, সবাই তার কথা অনুসরণ করেন। কিন্তু যারা নিজেদের কথা শোনানোর জন্য বা শ্রদ্ধা পাওয়ার জন্য বোকাদের সাহায্য গ্রহণ করেন, অর্থাত্ যারা বোকা বা মূর্খদের দিয়ে নিজেদের সম্পর্কে প্রচারের ব্যবস্থা করেন, তাদের ঘরে কোনোদিন সুখ শান্তি থাকতে পারে না। এদের ঘরে কোনো দিন লক্ষ্মী অবস্থান করবেন না।

তবে বোকা মানুষ অন্যকে ঠকাতে পারে না। বরং নিজে ঠকে। এমন কথা আমরা প্রায়ই শুনি যে, ‘বোকা পেয়ে সবাই আমাকে ঠকিয়ে নিচ্ছে।’ আসলে আমাদের সমাজে ‘সত্’ এবং ‘বোকা’ কার্যত সমার্থক। আজকের পৃথিবীতে কেউ বোকা হতে চায় না।

কিন্তু এটা একটা জাতির জন্য মোটেও স্বস্তির নয়। আমাদের চারপাশের পৃথিবীতে কি এটাই সাব্যস্ত হবে যে, সত্ মানেই বোকা? নতুন প্রজন্ম কি বিশ্বাস করতে শিখবে যে, সততা কোনো গুণ নয়, অন্যকে ঠকানোর ‘অক্ষমতা’ মাত্র?

এ প্রসঙ্গে আরো দু-একটি প্রশ্নও মাথাচাড়া দেয়। সচেতনভাবে বোকা হওয়ার মানসিকতা কি আসলে ‘অতি চালাকি’র কোনো প্রকাশ, যাতে অনেক সময় বাড়তি সুবিধার পথ খুলে যায়? নাকি নেহাত কিছু করতে না পারার হতাশা থেকে আড়াল কিংবা সান্ত্বনা খুঁজে নেওয়ার জন্য এটি এক বর্ম?

যুক্তি বলবে, পরিণত বয়সের একেবারে সাধারণ বোধসম্পন্ন কোনো ব্যক্তিও যদি বারংবার বুঝতে পারেন যে, তাকে ঠকানো হচ্ছে বা তিনি প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তাহলে স্বাভাবিক প্রবণতায় তিনি সতর্ক হবেনই। হতে পারে, কখনো পরিস্থিতির দায়ে, কখনো বিবিধ ক্ষমতাশালীর চাপে বহু ক্ষেত্রে তিনি হার মেনে নিতে ‘বাধ্য’ হন। যে কারো ক্ষেত্রেই এটা হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু সেটাকে তার স্বভাবজাত বোকামি বলে ধরে নেওয়া কিছুটা অতিসরলীকরণ হবে। ফলে এসবের সঙ্গে ব্যক্তিগত সততার সম্পর্ক খোঁজাও অর্থহীন।

গভীরভাবে ভেবে দেখলে, বোকা তো আমরা সবাই! যে সমাজে, যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক আবহে আমরা বাস করি, তাতে আমরাও কি নিয়ত বোকা হয়ে ঠকছি না? শক্তিধররা কেউ না কেউ কোথাও না কোথাও আমাদের মতো জনগণকে চিরকালই তো গুছিয়ে ‘ঠকিয়ে’ যায়। গত্যন্তর নেই বলে জ্ঞানপাপী আমরাও ‘বোকা’ থেকে যাই! কখনো এর আশ্বাসে মাথা হেলাই, কখনো ওর কথায়। এ দেশে এখন ‘সচেতন’ বোকারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। তারা ঠকেও শেখে না, ঠেকেও শেখে না!

এই যে রাজনীতির বাজারে হাজার প্রতিশ্রুতি, এটা-ওটা পাইয়ে দেওয়ার লম্বা ফর্দ উড়ে বেড়ায়। কিন্তু দিন শেষে অল্প কিছু মানুষ ফুলেফেঁপে উঠে। সংখ্যাগরিষ্ঠরা বঞ্চনার পাত্র বহন করে। ব্যাংকগুলো দেউলিয়া হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় নীতির সকল ‘বজ্র আঁটুনি’ অল্পকিছু সুযোগসন্ধানী মানুষের কাছে ‘ফসকা গেড়ো’য় পরিণত হয়। দেশের সাধারণ মানুষ কি জানেন না যে, কোথায় ফাঁক, কোথায় ফাঁকি? তথাপি ‘বোকা’ সকলকে হতেই হয়!

নানা কৌশলে একটা বিশেষ শ্রেণিকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে। তারা পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ‘সেকেন্ড হোম’ গড়ে তুলছে। কোনো বৈধ পথে নয়, জাদুকরের মতো ম্যাজিক দেখিয়ে টাকা বিদেশে পাচার করছে। বিদেশ থেকে কালো টাকা ফিরিয়ে আনা হয় না। বিদেশে টাকা পাচারও বন্ধ হয় না। ক্ষমতাসীনদের নামে নানা কথা বাজারে ঘুরে বেড়ায়।

‘বোকা’দের আজও তা কেউ খোলাসা করে বলেন না, কীভাবে কিছু কিছু মানুষ আলাদিনের চেরাগ পায়? কীভাবে তাদের সহায়-সম্পদ-ব্যাংক ব্যালেন্স বাড়ে? অবৈধভাবে অর্থ-সম্পদ উপার্জনকারীরা সব সময় ধরা-ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। যদিও দেশের তাবড় মন্ত্রী ও শাসক নেতারা জনগণ বলে অভিহিত ‘বোকাগণ’কে বুঝিয়েছেন, ওসব হলো প্রতীকী, মানে কথার কথা। ভাবখানা যেন, দূর বোকা, এসব করা যায় নাকি!

জিনিসপত্রের দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি কেবলই মিথ্যা আশ্বাসে পরিণত হয়। কর্মসংস্থান বাড়ে না। কৃষক ফসলের ন্যায্য মূল্য পায় না। ঘুষ-দুর্নীতি কমে না। ‘বোকা’দের জীবনে কোনো পরিবর্তন আসে না। ‘বোকা’রা শুধু শাসকের জৌলুস দেখে, বিক্রম দেখে। এদিকে জাঁদরেল মন্ত্রী ও কেষ্টবিষ্টু নেতার স্ত্রী-কন্যাদের নামে দেশে-বিদেশে নগদ ও সম্পত্তির পরিমাণ বাড়তেই থাকে। ক্ষমতায় বসে থাকা দলের ‘দুপয়সা-চার পয়সার নেতা’দের ঘরেও এখন শত শত কোটি কালোটাকার খনি ‘শোভা’ বর্ধন করে!

‘ধূর্ত’দের সঙ্গে কিছু কিছু ‘বোকা’ও অবশ্য সরকারি খয়রাতি বা অনুদানের লাইনে দাঁড়ান। সেখানে কেউ কেউ কিছু পেয়েও থাকেন। কিন্তু পাশের বাড়ির যুবকটি যখন বলেন, যোগ্যতা সত্ত্বেও তিনি শিক্ষকের চাকরি পাননি, মোটা ‘সালামি’ দিয়ে পেয়েছে ফেল করা অন্য কেউ, ‘বোকা’র হিসাব তখন গুলিয়ে যায়! দিনের শেষে কে ঠকছে? ঠকাচ্ছেই-বা কাকে?

বোকা-চালাকের দ্বন্দ্বে চালাকরাই এখন বিজয়ী হয়ে বীরদর্পে মাঝপথ দিয়ে চলছে। চালাক লোকগুলোর ধনসম্পদ-ক্ষমতা থাকলেও তাদের কান নেই। দুই কানই কাটা। তারা কোনো সমালোচনাকেই গায়ে মাখে না। এক কান কাটা গাঁয়ের ধার দিয়ে কেন যায়? কারণ, তার লজ্জাশরম তখনো কিছুটা অবশিষ্ট থাকে। সে চুল দিয়ে কাটা কান ঢাকার চেষ্টা করে। কখনো পারে, কখনো পারে না। এদিক-সেদিক ফালুক-ফুলুক চায়। সেই দৃষ্টিতে অপরাধবোধের রেশ কিছুটা হলেও থাকে। কিন্তু দুই কান কাটা গাঁয়ের মাঝখান দিয়ে বীরদর্পে হাঁটে। তার আর বাড়তি কিছু হারানোর ভয় নেই। সে যে নির্লজ্জ-বেহায়া, সেটুকু জাহির করতে দ্বিধাগ্রস্ত হয় না। তাতে আখেরে তার লাভ হয়। কেননা, সে অন্যদের সমীহ আদায় করে। ঘৃণাও। যদিও তাতে তার কিছু যায়-আসে না।