মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল

226
মিয়ানমারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জাতিসংঘের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল।

সুপ্রভাত বগুড়া (আন্তর্জাতিক): আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের মাধ্যমে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। আরাকান আর্মির সঙ্গে মিয়ানমার বাহিনীর চলমান সংঘাতে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি এবং দেশটির সেনাবাহিনীর নৃশংসতার যথেষ্ট তথ্য প্রমাণ থাকার প্রেক্ষাপটে সংস্থাটি এ আহ্বান জানিয়েছে।

সোমবার (১২ অক্টোবর) অ্যামনেস্টি একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ভুক্তভোগীদের সাক্ষাতকার, স্থিরচিত্র এবং ভিডিও তথ্য, প্রমাণের ভিত্তিতে সংস্থাটি জানায়, সংঘাতের মূল কেন্দ্র শান এবং রাখাইনে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগকে ভয়াবহভাবে উপেক্ষা করছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আঞ্চলিক উপ-পরিচালক মিং ইউহ হা বলেন, আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যকার সংঘাত নিরসনের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। তাদের সহিংসতার বলি হচ্ছে সাধারণ বাসিন্দারা।

মিং ইউহ হা বলেন, সাধারণ মানুষের অধিকার অব্যাহতভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে। লঙ্ঘনের এ মাত্রা দিনে দিনে আরো ভয়াবহ এবং আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সংঘাত কবলিত শান এবং রাখাইন রাজ্যে পুঁতে রাখা বোমা এবং বিস্ফোরণে বেশ কয়েকজন বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছে।

অতি সম্প্রতি মিয়ানমারের পালেতওয়া সামরিক ঘাঁটির কাছে বাঁশ কুড়াতে গিয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর ৪৪ বছর বয়সী এক নারী পুঁতে রাখা বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয়। ৮ সেপ্টেম্বর ময়েবন শহরতলীর এক শ্রমিকের স্ত্রী এবং কন্যা দু’পক্ষের গোলাগুলিতে নিহত হয়েছে। রাখাইন এবং শান রাজ্য নিয়ে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলীয় অঞ্চলে বৃহত্তর স্বায়ত্বশাসন গড়ে তুলতে চায় বিদ্রোহীগোষ্ঠী আরাকান আর্মি।

তাতমাদাও নামে পরিচিত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী তাদের মোকাবিলা করছে। রাখাইনে ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বসবাস করতো। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর নৃশংসতা থেকে বাঁচতে প্রতিবেশি বাংলাদেশে পালিয়ে আশ্রয় নেয় সাড়ে ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা।

মিয়ানমার সেনাবাহিনী হামলা চালাচ্ছে: 
সংঘাতে স্ত্রী এবং সন্তান হারানো প্রত্যক্ষদর্শী ওই ব্যক্তি অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালকে বলেন, এখানে বিদ্রোহীগোষ্ঠী আরাকান আর্মির কোনো অস্তিত্ব নেই। গ্রামবাসীর দাবি, মিয়ানমার সেনবাহিনী পার্শ্ববর্তী ঘাঁটি থেকে স্থানীয়দের লক্ষ্য করে গোলাবারুদ নিক্ষেপ করছে। সাত বছর বয়সী দুই শিশুসহ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৩ সদস্য নিহত হয়েছে। স্থানীয় সিভিল সোসাইটি গ্রুপের দেয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৮ সালের ডিসেম্বর থেকে শান এবং রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর ‍গুলিতে ২৮৯ জন নিহত হয়েছে।

আহত হয়েছে ৬৪১ জন। অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, বাস্তুচ্যুত হয়ে লক্ষাধিত মানুষ। সংঘাতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবং বিদ্রোহীরা অ্যান্টি পারসোনাল ডিভাইস ব্যবহার করে। এ ধরনের হামালা তথ্য প্রমাণ দিয়ে সবসময় প্রমাণ করা সম্ভব হয় না বলে জানায় অ্যামনেস্টি। চলাফেরায় বর্তমানে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার কারণে তথ্য প্রমাণ সংগ্রহ আরো কঠিন বলেও জানানো হয়। অ্যামনেস্টি জানায়, মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ, গণমাধ্যমে সরকারি কঠোর হস্তক্ষেপের কারণে প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করাও কঠিন।

কিন্তু ২০২০ সালে সাধারণ মানুষের উপর মিয়ানমার সেনাবহিনীর নির্বিচারে বিমান হামলা এবং গোলা নিক্ষেপের ঘটনা যাচাই করেছে অ্যামনেস্টি। ওই হামলায় শিশুসহ অনেকে হতাহত হয়। সম্প্রতি জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের সভায় সংস্থার কমিশনার মিশেল ব্যাশেলেট জানান, রাখাইন রাজ্যে সাধারণ মানুষকে নির্বিচারে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী। যা যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে বলেও জানান তিনি।

যৌন সহিংসতা: 
১১ সেপ্টেম্বর মিয়ানমার সেনাবাহিনী স্বীকার করেছে জুন মাসে রাথেডং শহরতলীতে অভিযানে গিয়ে সংখ্যালঘু এক রোহিঙ্গা নারীকে তিন সদস্য মিলে ধর্ষণ করে। এক বিবৃতিতে ভুক্তভোগীর নাম জনস্মুখে সেনাবাহিনী প্রকাশ করলেও ধর্ষণকারীদের নাম প্রকাশ করা হয়নি। অ্যামনেস্টির মিং ইউহ হা বলেন, মিয়ানমার সেনাবাহিনী বাধ্য হয়ে অপরাধ স্বীকার করলেও ভয়াবহ যৌন সহিংসতার দোষে তাদের কোনো জবাবদিহিতার আওতায় আনা হয়নি। বরং জবাবদিহিতাকে তারা উপেক্ষা করেছে। ভয়াবহ নৃশংসতার দোষ স্বীকারের পরও সেনাবাহিনী তাদের সদস্যদের দায়মুক্তি দিয়েছে।

স্যাটেলাইটের পাওয়া ছবি এবং প্রত্যাক্ষদর্শীদের বরাতে অ্যামনেস্টি জানায়, সেপ্টেম্বরের শুরুতে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইনের একটি গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ৩ সেপ্টেম্বর রাখাইনের হাপা ইয়ার পায়ং গ্রামে আগুন দিয়েছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। দেশটির সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারলে জাও মিন তুন সংবাদিকদের বলেন, ওই গ্রামের কাছেই পুলিশ ভ্যানে হাতে তৈরি বোমা দিয়ে হামলা চালায় আরাকান আর্মি।

অ্যামনেস্টির তথ্য মতে রাখাইনের ওই গ্রাম থেকে ৩ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় দুই ব্যক্তিকে তুলে নিয়ে যায় সেনাবাহিনী। পরদিন সকালে স্থানীয় নদীর পাড়ে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাদের মরদেহ পাওয়া যায়। অ্যামনেস্টির মিং ইউহ হা বলেন, রাখাইনের পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এখনি ব্যবস্থা নেয়া উচিৎ। অন্যথায় ব্যর্থতার দায়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব আবারো প্রশ্নবিদ্ধ হবে।