যেভাবে পারবেন খুব ভালো একটি ঘুম দিতে !

25
যেভাবে পারবেন খুব ভালো একটি ঘুম দিতে ! প্রতিকী-ছবি

ডা. অপূর্ব চৌধুরী


সুপ্রভাত বগুড়া (জীবন-জীবীকা): জীবনের এক তৃতীয়াংশ কাটে ঘুমে । আর ঘুম হয় একটি রাসায়নিক উপাদানের কারণে । নাম : মেলাটোনিন । মাথার ভেতর পিনিয়াল নামের একটি গ্ল্যান্ড থেকে এটি বের হয় ।উপাদানটি বেরিয়ে আসে অন্ধকার পেলে । কমে যায় আলো দেখলে ।

অনেকে তাই মেলাটোনিনকে অন্ধকারের হরমোন বলে । ঘুমের স্টেজ দুটি । শুরুতে ঘুম ঘুম ভাব, তারপর পুরো ঘুমের ভাব । বিজ্ঞানের ভাষায় ঘুম ঘুম ভাবকে বলে non REM এবং পুরো ঘুমকে বলে REM । REM মানে হলো Rapid Eye Movement ।

জেগে থাকলে চোখের বল এদিক-ওদিক ঘুরে । ঘুম ঘুম ভাবের সময় চোখ বন্ধ করলে চোখের বল ঘোরা থেমে যায় । ঘুম ঘুম ভাবের সময় এই চোখ না ঘোরাকে বলে non REM । এই সময় ঘুম হয় না, ঘুমের চেষ্টা করা হয় । একবার এপাশ ঘুরে তো আরেকবার ওপাশে ফিরে ।

একবার কোলবালিশ পেঁচিয়ে ধরে, আরেকবার গালে হাত দিয়ে একপাশে চেপে মরে । এই করতে করতে হঠাৎ মনে হয় যেন কোথায় ঢুকে যাচ্ছে । এপাশ-ওপাশ ঘোরা বন্ধ হয়ে যায় । ঠিক তখন চোখের বল ঘুরতে থাকে । এই জন্যে এই স্টেজকে বলে REM । আর এই স্টেজটাই আসল ঘুম । আসল ঘুম ।

এই সময়ে শরীর ঘুরে না, কিন্তু চোখ ঘুরে । কারণ হলো, এই সময়ে মস্তিষ্কের ভেতর যা ঘটতে থাকে কাণ্ড, চোখ তাকে দেখতে থাকে । আর এই মস্তিষ্কের কাণ্ডটি হলো স্বপ্ন । জাগ্রত অবস্থায় চোখ যেমন ঘোরে, ঘুমন্ত অবস্থায় তেমনি স্বপ্ন দেখতে চোখ ঘোরে । আর যখন স্বপ্ন দেখতে থাকে, তখনই বাস্তব থেকে সরে গেছে বলে সেটিকে পুরো ঘুম বলে ।

দেখা গেছে ঘুমের এই দুই স্টেজের মধ্যে পঁচাত্তর ভাগ হলো ঘুম ঘুম ভাবের non REM । বাকি পুরো ঘুমের REM হলো মাত্র ২৫ ভাগ । তাই লোকে অনেকক্ষণ ঘুমালেও বেশিক্ষণ স্বপ্ন দেখে না । পুরো দুই স্টেজের সাইকেলটি একবার শেষ হতে দুই ঘন্টা লাগে । আট ঘন্টা ঘুমোলে চার বার এমন সাইকেল ঘটে ।

তারমানে – আট ঘন্টা ঘুমের মাত্র দুই ঘন্টা প্রকৃত ঘুমে কাটে । আর এই দুই ঘন্টা ঘুম ঠিক মতো দেওয়াও অনেকের জন্যে কঠিন হয়ে যায় ! অথচ বিছানায় আট ঘন্টা শুয়ে থেকে চ্যাপ্টা হবার উপক্রম হয় । তাহলে কি করে ভালো একটি ঘুম দিতে পারবেন ?

এক. সন্ধ্যের পর ঘরের আলো যত কম রাখা যায় । বারান্দার লাইট জ্বালালে সিটিং রুমে টেবিল ল্যাম্প জ্বালান । তৈরী করুন একটি আলো আঁধারির পরিবেশ । কারণটি ঘুমের প্রসেসের মধ্যেই আছে । বলেছিলাম শুরুতে – ঘুম হয় মেলাটোনিন সিক্রেট হলে ।

যত বেশি মেলাটোনিন, তত তাড়াতাড়ি ঘুম । মেলাটোনিন অন্ধকারের হরমোন । দুই. সন্ধ্যায় চা-কফি খাবেন না । চা কিংবা কফি খাবেন সকালে কিংবা দুপুরে । রাতে নয় । এক কাপ কফির এফেক্ট শরীরে থাকে দশ থেকে বারো ঘন্টা ।

বিকেল পাঁচটায় কফি খেলে শরীরে তার ইফেক্ট যেতে হয়ে যাবে রাত দুটা ! তিন. রাতে পেট পুরে খাবেন না । গলা পর্যন্ত খাবেন না । এমন খান, যাতে মনে হয় আশি ভাগ পেট পুরেছে । বেশি খেলে শরীর ব্যস্ত থাকে অধিক সময় নিয়ে পরিপাক করতে ।

যতো বেশি সময় নেবে, ততো দেরিতে ঘুম হবে । চার. বিছানায় যাবার তিন ঘন্টা আগে রাতের খাবার খাবেন । শরীরে খাদ্য পরিপাকের গড় সময় দুই ঘন্টা । দেশের লোকজন রাত দশটায় খায় । বিছানায় যায় এগারোটায় । তারপর হয়তো সোশ্যাল মিডিয়ায় উঁকি ঝুঁকি দিয়ে ঘুম আসে দুটায় !

রাতের খাবার খাবেন আটটা থেকে নয়টায় । দেখবেন – বারোটার আগেই ঘুম চলে আসবে । পাঁচ. রাতে মাংস খাবেন না । পরিপাক হতে সময় নেয় । মাছ, শাক-সবজি, ডাল খাবেন । সাথে সালাদ । মিষ্টি না খেয়ে দই খাবেন । ফল খাবেন দিনের বেলায় ।

ছয়. বিছানায় যাওয়ার এক ঘন্টা আগে টিভি এবং মোবাইল ফোন দুটোই বন্ধ রাখবেন । যে কোনো স্ক্রিন থেকে বের হওয়া আলো মস্তিষ্ক থেকে মেলাটোনিন বের হতে বাধা দেয় । সাত. বিছানায় উত্তেজনাকর কিছু পড়বেন না !

পত্রিকা হোক, সোশ্যাল মিডিয়ার হোক, কিংবা উষ্ণ কিছু ! কবিতা – মন এবং মস্তিষ্ককে সুস্থির করে । ছোট ছোট অনুপ্রেরণার কথাও মনকে ধীর এবং গভীর করে তুলে । আট. বিছানায় যাবার আগে দাঁত ব্রাশ করুন, হাত, মুখ এবং পা ধুয়ে নিন ।

যারা নামাজ অথবা পুজো করেন, প্রার্থনা করুন । ঘুমের আগে প্রার্থনা কিংবা মেডিটেশন – শরীর এবং মনকে সুস্থির করে । নয়. ঘুমের আগে বিছানায় বা রুমে কোনো সুগন্ধি স্প্রে করুন । নিজের প্রিয় কোনো গন্ধ মস্তিষ্ককে রিলাক্স করে ।

দশ. সর্বশেষ, ঘুমের আগে এলকোহল খাবেন না । এলকোহল ঘুম আনায় না, উল্টো ঘুম হরণ করে ।

অপূর্ব চৌধুরী চিকিৎসক এবং লেখক জন্ম বাংলাদেশ, বসবাস ইংল্যান্ড, উল্লেখযোগ্য বই : অনুকথা, জীবন গদ্য, বৃত্ত ।