রবিউল আউয়ালে দুনিয়ায় আগমন করেন মহানবী (সাঃ)

77
রবিউল আউয়ালে দুনিয়ায় আগমন করেন মহানবী (সাঃ)

আলহাজ্ব হাফেজ মাওঃ মুহাম্মদ আজিজুল হক

সুপ্রভাত বগুড়া (ধর্ম ও জীবন): পবিত্র মাহে রবিউল আউয়ালের সোমবারে মক্কা মুকাররমায় জন্মগ্রহণ করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ (সাঃ)। সনটি ছিল ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দ। পৃথিবীতে তাঁর আগমন গোটা সৃষ্টিকুলের জন্য রহমতস্বরুপ। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বকুলের জন্য রহমতস্বরুপ প্রেরণ করেছি (সূরা-আম্বিয়া,আয়াত-১০৭)। মহান আল্লাহ মানবজাতির হেদায়েতের জন্য যুগে যুগে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন এলাকায় নবী-রাসূল প্রেরণ করেছেন। সেসব পয়গাম্বরগণ নির্দিষ্ট এলাকায় নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অর্পিত দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে এ পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।

সর্বশেষ নবী ও রাসূল হিসেবে আগমন করেন সাইয়্যিদুল মুরসালীন মুহাম্মাদ (সাঃ)। তিনি কোন বিশেষ এলাকার নবী নন, কোন নির্দিষ্ট সময়েরও নবী নন, বরং কেয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী সকল মানবের তিনিই একমাত্র নবী। আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমি আপনাকে সমগ্র মানবের জন্য সুসংবাদদাতা ও ভীতিপ্রদর্শনকারী হিসেবে প্রেরণ করেছি (সুরা-সাবা,আয়াত-২৮)। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর জন্ম তাঁর এ জগতে আগমন নিশ্চয় আমাদের জন্য সুসংবাদ ও আনন্দের বিষয়। তাঁর মাধ্যমে কুরআন পেয়েছি, ইসলাম গ্রহণের তাওফীক লাভ করেছি। তাই এ দুটি নিয়ামতের জন্য জগতবাসীর আনন্দিত হওয়া এবং সন্তুষ্ট থাকা উচিত। ইরশাদ হচ্ছে, (হে মুহাম্মাদ) আপনি বলে দিন, তারা যেন শুধু আল্লাহর অনুগ্রহ (কুরআন) ও দয়ার (ইসলাম) উপর আনন্দিত হয়। কারণ,তা দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছুর চেয়ে উত্তম (সূরা-ইউনুস,আয়াত-৫৮)।

বুঝা গেল, সমস্ত নিয়ামতের উৎস হচ্ছে, এ ধরায় মহানবী (সাঃ) এর আগমন । সুতরাং মীলাদুন্নবীতে (সাঃ) আনন্দিত হওয়া ও খুশি প্রকাশ করা ঈমানের দাবী। দরুদ পাঠের মাধ্যমে, সুন্নাতের অনুসরণের মাধ্যমে খুশি প্রকাশ করতে হবে। তাঁকে মনেপ্রাণে মুহাব্বত করতে হবে এবং তাঁর আদর্শকে আঁকড়ে ধরতে হবে। কারণ, নবীজি (সাঃ) এর প্রতি মুহাব্বত-ভালবাসা প্রদর্শন করা মহান আল্লাহ ও স্বয়ং রাসূল (সাঃ) এর নির্দেশ এবং তা দ্বীন ও ঈমানের অংশ। আল্লাহপাক ইরশাদ করেন, আল্লাহ নবীর প্রতি অনুগ্রহ করেন এবং তাঁর ফেরেশতাগণও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা করে। সুতরাং, হে মুমিনগণ! তোমরাও নবীর জন্য অনুগ্রহ প্রার্থনা কর এবং যথাযথভাবে সালাম জানাও (সূরা-আহযাব,আয়াত-৫৬)। অন্যত্র ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি রাসূলের আনুগত্য করল, সে আল্লাহরই আনুগত্য করল (সূরা-নিসা, আয়াত-৮০)।

একবার হযরত উমর (রাঃ) নবীজি (সাঃ) কে বললেন, নিঃসন্দেহে আপনি আমার কাছে আমার জীবন ব্যতীত সমস্ত কিছু থেকে অধিক প্রিয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) কসম খেয়ে বললেন, হে উমর! তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত আমি তোমার কাছে তোমার জীবন থেকেও অধিক প্রিয় না হব। এরপর উমর (রাঃ) বললেন, আল্লাহর কসম! এখন আপনি আমার কাছে আমার জীবন অপেক্ষা অধিক প্রিয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, হে উমর ! এখন তুমি পূর্ণ মুমিন হয়ে গেল (বুখারী)। বস্তুত বিশ্বনবীর (সাঃ) প্রতি ভালবাসা মানব জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ। যে সত্যিকারের আশেকে রাসূল তার ইহকাল পরকাল সফল। দুনিয়াতে যত ইবাদত আছে সকল ইবাদতের মূল হল আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সাঃ) কে ভালবাসা।

অন্যান্য ইবাদত হল এর শাখা-প্রশাখা মাত্র। হযরত আনাছ (রাঃ) বলেন, একদিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, হে বৎস! যে আমার সুন্নাতকে ভালেবাসে, সে আমাকেই ভালেবাসে আর যে আমাকে ভালবাসে, সে বেহেশতে আমার সাথে থাকবে (তিরমিজি)। আমরা একটু মুহাসাবা করে দেখি তো, নিজেদের আকীদা-বিশ্বাস, কাজ-কর্ম, ব্যবসা-চাকুরী, মুআমালাত-মুআশারাত মোটকথা সর্বক্ষেত্রেই এই মহামানবের আদর্শের অনুসরণ করি কি ? উত্তর যদি না হয়, তাহলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর ভালবাসা-মুহাব্বতের দাবী করা মিথ্যা ও বাতুলতা ছাড়া কিছুই নয়। সোমবারে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর জন্মের কারণে আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রতিটি সোমবার অধিক মর্যাদাপূর্ণ। হুজুর (সাঃ) নিয়মিত সোমবারে রোজা রাখতেন।

এ দিনের রোজা সর্ম্পকে নবীজি (সাঃ) কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বললেন, ‘এদিনে জন্ম গ্রহণ করেছি, এদিনে প্রথম ওহিপ্রাপ্ত হয়েছি। তারই শুকুরিয়াস্বরুপ রোজা পালন করি’। তাই আমাদের উচিত, বছরের প্রতিটি সোমবারে রোজা রাখা। সম্ভব না হলে অন্তত রবিউল আউয়ালের সোমবারের রোজাগুলো রাখা কর্তব্য। যদি সীরাতুন্নবী (সাঃ) কে বাদ দিয়ে কেবল মীলাদুন্নবীতে (সাঃ) খুশি প্রকাশ করা হয়, অর্থাৎ শুধু নবীর জন্মেই খুশি-আনন্দ প্রকাশ করা হয়,তাঁর আদর্শে খুশি না হওয়া যায়, তাহলে এটা আবু লাহাবের ভালবাসার অবস্থার মত। যে আবু লাহাব ভাতিজা মুহাম্মাদ (সাঃ) এর জন্মের সুসংবাদ দানকরিনী দাসি ছুওয়াইবাকে আযাদ করেছিল। পরবর্তীতে সেই হলো আল্লাহর রাসূলের আদর্শের ঘোরতর শত্রæ।