রোগ-ব্যাধি ও বিপদ-আপদও আল্লাহর রহমত

181
রোগ-ব্যাধি ও বিপদ-আপদও আল্লাহর রহমত। প্রতিকী-ছবি

আলহাজ্ব হাফেজ মাওঃ মুহাম্মদ আজিজুল হক

সুপ্রভাত বগুড়া (ধর্ম ও জীবন): প্রত্যেক অযাচিত বিষয়কে বিপদ বলা হয়। আল্লাহ তায়ালা বিপদ সব সময় রাগ করে দেন না বরং দয়া করেও দিয়ে থাকেন। উভয় অবস্থাতেই বিপদ বান্দার জন্য রহমত। পাপের কারণে বিপদ দিয়ে বান্দাকে সতর্ক করা হয়, সে যেন পাপ কাজ থেকে বিরত থাকে এবং জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি থেকে বেঁচে জান্নাত লাভ করতে পারে।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, (আখিরাতের) গুরু শাস্তির পূর্বে আমি অবশ্যই (দুনিয়াতে) তাদেরকে লঘু শাস্তি আস্বাদন করাব, যাতে তারা দুস্কর্ম থেকে প্রত্যাবর্তন করে। (সূরাঃ সেজদাহ, আয়াত-২১) আবার কখনো বিপদ-মসিবত বান্দার পরিক্ষা স্বরূপ এবং তার দরজা-মর্যাদা বৃদ্ধি করার জন্যও দেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, অবশ্যই আমি তোমাদিগকে পরিক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা, জান ও মালের ক্ষতি এবং ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও সবরকারীদের। (সূরাঃ বাকারা, আয়াত-১৫৫)

হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যার সাথে আল্লাহ ভালো করতে চান তাকে বিপদগ্রস্ত করেন। (বুখারী) বান্দা বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করে এমন স্তরে পৌঁছতে পারে যেখানে সাধারণ ও নিয়মিত ইবাদত বন্দেগী দ্বারা পৌঁছা সম্ভব নয়। বিপদ-মসিবত দ্বারা কিছু লোককে তাদের গোনাহের শাস্তি দেয়া হয়, এবং কিছু লোককে মর্যাদা বৃদ্ধি অথবা গোনাহের কাফফারার জন্য বিপদে নিক্ষেপ করা হয়। অথচ উভয় ক্ষেত্রে বিপদাপদের আকার একই রূপ হয়ে থাকে।

এমতবস্থায় উভয়ের পার্থক্য কিরূপে বোঝা যাবে? হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রাঃ) এ প্রশ্নের উত্তরে বলেন, যে বিপদের কারণে মানুষ আল্লাহর প্রতি অধিক মনোযোগী, অধিক সতর্ক এবং তাওবা ও ইস্তেগফারের প্রতি আগ্রহী হয় সে বিপদ শাস্তির বিপদ নয়, বরং প্রতিপালকের মেহেরবানী ও কৃপা। পক্ষন্তরে যার অবস্থা এরূপ হয় না, বরং হা-হুতাশ করতে থাকে, অধৈর্য হয়ে যায়, বিলাপ শুরু করে এবং পাপকার্যে অধিক উৎসাহী হয়, তাহলে এটা আল্লাহর ক্রোধ ও আযাবের আলামত। হাদিসে বর্ণিত আছে, সার্বাপেক্ষা কঠিন বিপদাপদ আসে নবীদের উপর তারপর যারা তাদের অনুসরণে অগ্রগামী তাদের উপর এবং তারপর তাদের পরবর্তী স্তরের লোকদের উপর। (মিশকাত) অর্থাৎ অনুসরণ অনুকরণে যারা নবীদের যতবেশী নিকটবর্তী সেই ক্রমানুসারেই তাদের উপর বালা মসিবত এসে থাকে।

যে যত বেশী নিকটবর্তী তার উপর বালা মসিবতও ততবেশী আসে। হাদিসখানা বিপদে পতিত ব্যক্তির জন্য সুসংবাদ ও সান্তনাবাণী। এ হাদিস জানাচ্ছে, আল্লাহ তায়ালা তাঁর মুহাব্বতের নিদর্শন, দয়া ও অনুগ্রহের আলামত হিসেবেই এ কষ্ট-দুঃখ দিয়ে থাকেন। এ কষ্ট তাঁর অসন্তুষ্টির প্রকাশ নয়। কেননা এ জগতে আম্বিয়া (সাঃ) অপেক্ষা কেউ আল্লাহর অধিক প্রিয় ছিলেন না, থাকতে পারে না। হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-কে দেখুন, খলিলুল্লাহ হওয়া সত্বেও কত বড় ও কঠিন বিপদ তাঁর ওপর দিয়ে গেছে।

প্রশ্ন হতে পারে আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের এত দুঃখ-কষ্ট কেন? হাদিসে আছে, একবার ফেরেশতাগণ আল্লাহকে জিজ্ঞেস করেন, ইয়া আল্লাহ! এই ব্যক্তি তো আপনার প্রিয় বান্দা, বড় ভালো মানুষ। আপনাকে ভালোবাসে। তা সত্বেও তার উপর এত কষ্ট-ক্লেশ কেন বর্ষণ করছেন? আল্লাহ তায়ালা বলেন এ বান্দাকে এ অবস্থাতেই থাকতে দাও। কেননা তার দুআ কান্নাকাটি ও উহ-আহ আওয়াজ শুনতে আমি ভালোবাসি। (ইসলাহী খুতুবাত)

হযরত আমের (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, মুমিন যখন বিপদগ্রস্থ হয়, তারপর আল্লাহ তাকে মুক্তি দান করেন, এটা তার অতীতের গোনাহের জন্য কাফফারা এবং ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষার বস্তু হয়, কিন্তু মুনাফিক যখন বিপদগ্রস্থ হয়, তারপর তাকে মুক্তিদান করা হয়, সে সেই উটের মতো হয়, যাকে বেঁধেছিল এরপর ছেড়েদিল।

সে বুঝল না যে, তাকে কেন বেঁধেছিল এবং কেন তাকে ছেড়ে দিল। (আবু দাউদ) বুখারী শরীফে হযরত আবু সাইদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবীজি (সাঃ) বলেন, ‘মুসলমানের কোন বিপদ, কোন রোগ, কোন ভাবনা, কোন চিন্তা, কোন কোষ্ট বা দুঃখ, এমনকি যদি তাঁর শরীরে কোন কাঁটাও বিঁধে এর বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা তার গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেন’।

অন্যত্র আছে, সুখ-শান্তি ভোগী ব্যক্তিরা কিয়ামতের দিন যখন দেখবে, বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিদের সওয়াব দেওয়া হচ্ছে, তখন আপেক্ষ করবে আহা! তাদের চামড়া যদি দুনিয়াতে কাঁচি দ্বারা কাঁটা হত! (তিরমিযি) আমাদের ঈমানী শক্তি কম বিধায় কোন বিপদ চেয়ে নেয়া ঠিক হবে না তবে বিপদাপদ আসলে এটাকে আল্লাহর রহমত মনে করে বিনয়ী হতে হবে এবং তা থেকে পরিত্রাণের জন্য দুআ করতে হবে।