শাওয়াল মাসের তাৎপর্য ও আমল

73

আলহাজ্ব হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুল হক

সুপ্রভাত বগুড়া (ধর্ম ও জীবন): আরবী বছরের দশম মাস হচ্ছে মাহে শাওয়াল। ১লা শাওয়াল হলো মুসলমানদের খুশির দিন তথা ঈদুল ফিতর। নবীজি (সাঃ) বলেন, মুসলমানদের জন্য বছরে দু’টি ঈদ রয়েছে। একটি ঈদুল ফিতর (রোজার ঈদ) আর অপরটি ঈদুল আজহা (কুরবানীর ঈদ)। দুই ঈদের রাতও অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।

হাদিসে আছে , যে ব্যক্তি ঈদের রাতে জাগরত থেকে আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল থাকবে, তাহলে যেদিন অন্যান্য দিল মরে যাবে, সেদিন তার দিল মরবে না অর্থাৎ কিয়ামতের দিনের আতংকের কারণে অন্যান্য লোকের অন্তর ঘাবড়ে গিয়ে মৃতপ্রায় হয়ে যাবে কিন্তু দুই ঈদের রাত্রে জাগরণকারীর অন্তর ঠিক থাকবে-ঘাবড়াবে না। (বেহেশতী জেওর) এমাস ঈমানদারদের পরীক্ষার মাস।

কেননা এই মাসে বিতাড়িত শয়তান শিকলমুক্ত হয়ে আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণকে বিপথে পরিচালিত করার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়ে থাকে এবং রমজান মাসের পরাজয়ের প্রতিশোধ গ্রহণে বদ্ধপরিকর হয়। এজন্য এই মাসে প্রত্যেক ঈমানদার বান্দাকে খুবই সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। যাতে পা পিছলাইয়া না যায় এবং পুরো রমজানের মেহনতের ফসল বিনষ্ট না হয়।

রমজানের রোজা ফরজ। আর শাওয়াল মাসে অতিরিক্ত ছয়টি রোজা রাখা নফল বা মুস্তাহাব। শওয়ালের এ ছয়টি রোজার ফজিলত সম্পর্কে হাদিস শরীফে আছে, হযরত আবু আইয়ূব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (সাঃ) ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি রমজানের রোজা রাখলো, অতঃপর শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখলো, সে যেন সারা বছর রোজা রাখলো। (মুসলিম)

অপর হাদিসে রয়েছে, হযরত ছাওবান (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি মাহে রমজানের রোজা রাখবে, সে এক মাস দশ মাসের সমান হবে। আর ঈদুল ফিতরের পর (শাওয়াল মাসে) ছয়টি রোজা রাখলে পূর্ণ এক বছরের রোজার সমতূল্য হবে। (মুসনাদে আহমদ) বুঝা যাচ্ছে, শাওয়ালের ছয় রোজার ফজিলত পরিপূর্ণভাবে তারাই লাভ করবে-যারা পুরো রমজানের রোজা রাখার পর শাওয়ালের রোজা রাখবে।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি একটি সৎকর্ম করবে, সে তার দশগুণ সওয়াব পাবে এবং যে একটি মন্দ কাজ করবে, সে তার সমান শাস্তিই পাবে। বস্তুতঃ তাদের প্রতি জুলুম করা হবে না। (সূরাঃ আনআম, আয়াতঃ ১৬০) আয়াতে বলা হয়েছে একটি নেকীর প্রতিদান দশগুণ পক্ষান্তরে একটি গোনাহর বদলা একটিই দেওয়া হবে। এমন দয়া ও অনুকম্পা সত্তে¡ও আল্লাহর দরবারে ঐ ব্যক্তিই ধ্বংস হতে পারে, যে ধ্বংস হতেই দৃতসংকল্প (মাআরিফুল কুরআন)।

এ রোজাসমূহকে শাওয়ালের ‘ছয় রোজা’ বলা হয়। আমাদের গ্রাম্য ভাষায় এটাকে ‘সাক্ষী রোজা’ বলে! রমজানের রোজার পর ফজিলতপূর্ণ রোজাসমূহের মধ্যে শাওয়ালের ছয়টি রোজা অন্যতম। রমজানের আগে ও পরে তথা শা’বান ও শাওয়াল মাসের রোজা রাখা হলো ফরজ নামাজের আগে ও পরে সুন্নাত নামাজের মতো। এতে করে ফরজ ইবাদতে যে সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি হয়, নফলের মাধ্যমে তার কাফফারা হয়ে যায়। ঈদুল ফিতরের দিন বাদে এই ছয়টি রোজা লাগাতারভাবে রাখা যায় আবার বিরতি দিয়েও রাখা যায়। তবে আলাদা আলাদা করে রাখাই উত্তম।

মোটকথা শাওয়াল মাসের ভিতরে ছয়টি রোজা রাখলেই এ সওয়াব হাসিল হবে। কিন্তু এমাসে কাযা রোজা রাখলে তার দ্বারা ছয় রোজার ফজিলত অর্জিত হবে না। (আহকামে যিন্দেগী) যে ব্যক্তি বিনা উজরে রমজানের কোন রোজা কাযা করেছে, তার কর্তব্য হচ্ছে, প্রথমে রমজনের কাযা রোজা আদায় করবে।

তারপর শাওয়ালের রোজা রাখবে। আর যে ব্যক্তির কোন সঙ্গত উজরের কারণে রমজানের কিছু রোজা বাদ দিয়ে থাকে, যেমন- অসুস্থতা বা সফরের কারণে কিংবা মহিলাদের হায়েজ বা নিফাসের কারণে, তাহলে যদিও সেগুলো শাওয়ালের ছয় রোজার পূর্বে আদায় করলে উত্তম হবে।

কিন্তু যদি তারা শাওয়াল মাসে উক্ত ছয় রোজা রেখে পরে যে কোন সময়ে রমজানের কাযা রোজা আদায় করে নেন, তাহলেও হাদিসে বর্ণিত ফজিলত লাভ করবেন। মুসলমানদের আল্লাহর গোলামির জন্য কোন সময় নির্ধারিত নেই যে, কেবল ঐ সময়ই ইবাদত করবে আর সেই সময় শেষ হয়ে গেলে আবার গুনাহের কাজে লিপ্ত হবে। বরং মানুষ দুনিয়াতে যতদিন বেঁচে থাকবে ততদিন তাকে ইবাদত করতে হবে।

আল্লাহপাক বলেন, তুমি তোমার রবের ইবাদত করো মৃত্যু আসা পর্যন্ত। (সূরাঃ হিজর, আয়াতঃ ৯৯) বিখ্যাত বুজুর্গ বাসীর আল হাফী (রহঃ) কে লোকেরা যখন বললো, কিছুলোক শুধু রমজান মাসেই ইবাদত করে, একথা শুনে তিনি বললেন, তারা নিকৃষ্ট লোক যারা শুধু রমজান মাসে আল্লাহকে ডাকে। পক্ষান্তরে প্রকৃত সৎ লোক তো তারাই যারা সারা বছর ধরে আল্লাহকে ডাকে।