শ্বেতী রোগেরও আছে চিকিৎসায়

8
শ্বেতী রোগেরও আছে চিকিৎসায়

ত্বকের স্তরে মেলানোসাইট নামের একটি কোষ থাকে। এই কোষ থেকে মেলানিন নামের একটি পিগমেন্ট তৈরি হয়, যা আমাদের গায়ের রং তৈরিতে ভূমিকা পালন করে থাকে। বিভিন্ন কারণে যখন মেলানিন তৈরিকারক মেলানোসাইট কোষগুলো চামড়ার কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় সম্পূর্ণ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে যায় তখন সে জায়গাটি হয়ে যায় একদম পুরোপুরি সাদা এবং এ রকমভাবে ত্বকের এক বা একাধিক জায়গা ধবধবে সাদা হয়ে যাওয়ার নামই শ্বেতী।

কারণ

Pop Ads

শ্বেতী রোগের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো আবিষ্কার করা না গেলেও এটাকে চিকিৎসাশাস্ত্রের ভাষায় অটো ইমিউন ডিজিজ বলে মনে করা হয়, যেখানে কোনো বিচিত্র রহস্যময় কারণে শরীর নিজের মধ্যে থাকা স্বাভাবিক কোষকেই নিজের শত্রু মনে করে সেগুলাকে নিজেই ধ্বংস করে ফেলে।

তবে এ ধরনের ঘটনার সঙ্গে রোগীর বংশপরম্পরা যেমন একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে, তেমনি মানসিক চাপ, হতাশা, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, অবসাদ এবং এ ধরনের যাবতীয় নেতিবাচক মানসিকতা ও সঠিক জীবনযাপন প্রণালী পালন না করার কারণে নিজের শরীরের স্বাভাবিক প্রতিরোধব্যবস্থা বাধাপ্রাপ্ত হওয়াও এ রোগের উৎপত্তির একটি বিরাট কারণ বলে মনে করা হয়।

আমাদের দেশে শ্বেতী রোগীর সংখ্যা কম নয় এবং প্রধানত দুটি কারণে রোগটি মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হিসেবে পরিণত হয়। এক হচ্ছে যেহেতু আমরা শ্বেতাঙ্গ নই, আমাদের ত্বক প্রধানত বাদামি, তাই শ্বেতী হলে সেটা বাহ্যিক সৌন্দর্যের বেশ বড় একটা অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে যদি সেটা শরীরের দৃশ্যমান অংশ যেমন—মুখ, হাত, গলা এ রকম অংশে হয়ে থাকে।

দ্বিতীয়ত, শ্বেতী রোগ নিয়ে অনেকের মনে অনেক রকম কুসংস্কার বা ভুল ধারণা আছে।
অনেকেই শ্বেতীকে কুষ্ঠ রোগ বলে মনে করে, আবার অনেকে এটাকে অভিশাপের ফলাফল বলে মনে করে থাকে, আবার অনেকে এটাকে ছোঁয়াচে রোগ বলে ধারণা করে থাকে। কিন্তু প্রকৃত সত্য হলো, এটা কুষ্ঠ বা অন্য কোনো রকমের ছোঁয়াচে রোগ তো নয়ই এবং অবশ্যই এই রোগ কারো কোনো অভিশাপের সঙ্গে জড়িত নয়।

চিকিৎসা

শ্বেতী রোগের চিকিৎসার ফলাফলের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।

■ যত কম সময় ধরে রোগটি শুরু হয়।

■ যত কম বয়সে রোগটির আবির্ভাব ঘটে।

■ যত কমসংখ্যক আক্রান্ত স্থান থাকে, রোগটি নিরাময় হওয়ার সম্ভাবনা ততই বৃদ্ধি পায়।

বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে শ্বেতীর চিকিৎসায়ও এসেছে বহু নতুন বাঁক এবং নতুন চিকিৎসাপদ্ধতি।

একসময় মনে করা হতো টকজাতীয় খাবার এবং ভিটামিন সি শ্বেতী বাড়িয়ে দেয়, কিন্তু এখন চিকিৎসাবিজ্ঞান সম্পূর্ণ বিপরীত কথা বলছে।

মূলত শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে যে ধরনের খাবার খাওয়া উচিত তার সবই এই রোগের অন্যতম প্রধান চিকিৎসার অন্তর্গত। তাই শাকপাতা ও ভিটামিন সি সংবলিত খাবার এখন এই রোগ নিরাময়ের জন্য বিশেষভাবে নির্দেশিত।
চিকিৎসার অন্যান্য পদ্ধতির মধ্যে বিভিন্ন ধরনের ক্রিমজাতীয় ওষুধ রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে বেশ ভালো ফলাফল দিয়ে থাকে। তবে ক্রিমজাতীয় ওষুধ ব্যবহারের সময় চিকিৎসকের নির্দেশনা সঠিকভাবে মেনে চলা এবং তাঁর সঙ্গে নির্দেশিত সময়ে সাক্ষাৎ করা বিশেষভাবে জরুরি।

সূর্যালোকের সঙ্গে এই রোগের চিকিৎসার বিশেষ একটি সম্পর্ক আছে। সে জন্য অনেক সময়ই কিছু বিশেষ ওষুধ আক্রান্ত স্থানে লাগিয়ে নির্দিষ্ট সময় সেখানে রোদ লাগালে সেখানে মেলানোসাইট কোষ নতুন করে তৈরি হওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় এবং ধীরে ধীরে আক্রান্ত ত্বক তার স্বাভাবিক রং ফিরে পায়। তবে অনেক ক্ষেত্রেই বাড়িতে শরীরের সব স্থানে রোদ লাগানোর মতো পরিস্থিতি থাকে না বলে এর পরিবর্তে এনবিইউভিবি আলোকরশ্মি বিশেষ যন্ত্রের মাধ্যমে শরীরের সব প্রয়োজনীয় স্থানে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে। এনবিইউভিবি অর্থ ন্যারো ব্যান্ড আলট্রা ভায়োলেট বি রশ্মি, যা সূর্যালোকের একটি বিশেষ বিভাজিত অংশ এবং এই অংশটিই মেলানোসাইট উৎপাদন উদ্দীপিত করে থাকে।

রোগ যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, সে ক্ষেত্রে অন্যান্য চিকিৎসার সঙ্গে এই রশ্মির চিকিৎসাও বিশেষভাবে কার্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে।

তবে সম্প্রতি লেজার রশ্মির সাহায্যেও এই রোগের চিকিৎসা করা হয়ে থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রেই এই চিকিৎসায়ও বেশ ভালো ফলাফল পাওয়া যায়।

লেখক : সিনিয়র কনসালট্যান্ট, ডার্মাটোলজি

উত্তরা স্কিন কেয়ার অ্যান্ড লেজার, ঢাকা